উন্নয়ন খাত থেকে রাজস্ব খাতে চাকরি স্থানান্তর নিয়ে জটিলতায় রাজশাহীর ৯টি উপজেলার ২৩২টি কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা টানা সাত মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১৪,৩২০টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হয় ১৯৯৮ সালে। সে বছর প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ১০ হাজার ৭৩২ টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। পরবর্তী বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে ২০০১ সালে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর রিভাইটালাইজেশন অবকমিউনিটি হেলথ কেয়ার ইনিশিয়েটিভস ইন বাংলাদেশ (কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প) এর আওতায় ২০০৯ সালে শীর্ষক পাঁচ বছর মেয়াদে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে লোকবল দেওয়া হয়। যা ২০২৪ সালে ২৬ বছর পূর্ণ হয়েছে। এটি তৎকালীন সরকার কর্তৃক গৃহীত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, যা এখনো দেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
রাজশাহীর নয়টি উপজেলায় মোট ২৩২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে, চারঘাট উপজেলা: ২৩টি, বাঘা উপজেলা: ২০টি, পবা উপজেলা: ৩২টি, তানোর উপজেলা: ১৯টি, মোহনপুর উপজেলা: ১৯টি, গোদাগাড়ী উপজেলা: ৩৪টি, দুর্গাপুর উপজেলা: ১৯টি, পুঠিয়া উপজেলা: ২৮টি, বাগমারা উপজেলা: ২০টি।
চারঘাট উপজেলার খোর্দগোবিন্দপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি জাকিয়া নাসরিন বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে সামান্য ওই বেতন দিয়ে টেনেটুনে কোনো রকমে সংসার চালাই। তারপর আবার গত তিন মাস থেকে তাও বন্ধ। দোকানদাররা আর বাকিতে জিনিস দিতে চাচ্ছেন না। কী যে বিপদে রয়েছি, কাউকে বলে বোঝাতে পারব না।
উপজেলার ঝিকরা কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) আক্তার বানু বলেন, আমরা প্রতিদিন শত শত রোগীকে সেবা দিচ্ছি, কিন্তু নিজেরাই দারিদ্র্যের শিকার। সাত মাস ধরে কোনো বেতন পাইনি, ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছি।
রাজশাহী জেলা কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোপ্রাইটর সমিতির সভাপতি সাইম হাসান বলেন, বিধি অনুযায়ী উন্নয়ন খাত থেকে চাকরি রাজস্ব খাতে যেতে স্বাস্থ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগের গাফিলতির কারণে যা গত সাত মাসেও হয়নি। এ কারণে জেলার ২৩২ জন হেলথ কেয়ার প্রোপ্রাইটর বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। অনেকেই ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ, পরিবারের অসুস্থ স্বজনদের চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে পারছেন না। বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।
তারা জানান, যদি দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধ না করা হয়, তাহলে অনেকে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। এতে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রাজশাহী জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ডক্টর মাহবুবা খাতুন বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের জটিলতার কারণে সাত মাস ধরে বন্ধ আছে। বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অবগত করা হয়েছে, দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।
রাজশাহীর ২৩২টি কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা সরকারের কাছে দ্রুত বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, আমরা মানুষের সেবা দিচ্ছি, কিন্তু নিজেরাই অসহায়। দ্রুত যদি এই সমস্যা সমাধান না হয়, তাহলে কর্মবিরতির মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবো।
রাজশাহীসহ সারা দেশের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেবে এমনটাই প্রত্যাশা স্বাস্থ্যকর্মীদের।