ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

দখল-চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ মানুষ

হাসানের মদদে চলছে আ.লীগ পুনর্বাসন

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৫, ১০:৪২ এএম

যশোরের চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসানের অর্থ-বাণিজ্য এবং সরাসরি মদদে উপজেলাজুড়ে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের পুনর্বাসনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ  নেতাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে চলছে বিশাল অঙ্কের অর্থের মাধ্যমে বিভিন্ন কমিটিতে পদ বণ্টন। 

তার দখল-চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ চৌগাছার বাসিন্দারা। প্রতিবাদ করলে খোদ বিএনপির ত্যাগী নেতাদের দেওয়া হচ্ছে দল থেকে বহিষ্কারের হুমকি বলে জানিয়েছেন উপজেলার বিএনপির নেতারা- এমন অভিযোগও মিলেছে। 

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আত্মগোপনে থাকা আ.লীগের নেতাকর্মীদের বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের গোপন মদদে মিছিল ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক আমিনুল হক বলেছেন, আ.লীগ পুনর্বাসনে জড়িতদের প্রতিরোধ করা হবে এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, আ.লীগ পুনর্বাসনকারীদের  ইতিহাস গণশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করবে।

চৌগাছা উপজেলায় যেসব আওয়ামী লীগ নেতা গত ১৭ বছর নির্যাতন, জুলুম, চাঁদাবাজির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন, তাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে বিএনপিতে। 

আওয়ামী লীগের সেসব নেতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও যশোর জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য মো. মেহেদী মাসুদ চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের পোস্টেড নেতা, যশোর জেলা সদস্য তৌহিদ দেওয়ান, ফুলসারা ইউপির চেয়ারম্যান মো. মাসুদ, সুখপুকুরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, উপজেলা মৎস্যজীবী লীগ সভাপতি, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চৌগাছা ইউপি চেয়ারম্যান মো. কাসেম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও জগদীশপুর ইউপির চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহিনী কমিটি সদস্য ও সিংগাঝুলি ইউপির চেয়ারম্যান হামিদ মল্লিক তরিকুল ইসলাম পৌর কলেজের অধ্যক্ষ আ.লীগ পৃষ্ঠপোষক-সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) অমিত কুমার বসুর ডান হাত ও ক্যাশিয়ারখ্যত মনজুরুল আলম লিটুসহ আরো অনেকে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পুনর্বাসন কাণ্ডে নীরব ভূমিকা পালন করছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি বলে জানা গেছে। 

সার্বিক পরিবেশ অনুকূলে থাকায় মাঝে মাঝেই শোডাউন এবং ঝটিকা মিছিল করছেন উপজেলা আ.লীগের নেতারা। চলছে শেখ হাসিনার প্রচারণা ও লিফটলেট বিতরণ। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী বলেন, এখানে আমরা যারা আওয়ামী লীগের সময়ে বাড়ি থাকতে পারিনি, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারিনি। অত্যাচারের শিকার হয়েছি। তাদের ওপর এখনো নির্যাতন করছে সেসব আ.লীগ নেতা। তারা এখন বড় বিএনপি বনে গেছে। তারা এখন বিএনপির কমিটিতে আসছেন। 

বাজার কমিটি, ব্যবসায়ী কমিটি, মৎস্য কমিটিসহ নানা কমিটিতে বড় পদে বসছেন। উপজেলার নানা কাজে তারা ইউএনও, উপজেলা বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে উঠাবসা করেন। 

অমিত বসুর ডানহাত তরিকুল ইসলাম পৌর কলেজের অধ্যক্ষ লিটু, যিনি উপজেলার পাতিবিলা হাই স্কুলের নিয়োগ বাণিজ্য থেকে টাকা হাতিয়েছে, এমনকি তার নিজ কলেজ থেকে তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগে অনিয়ম রয়েছে। তার এসব কাজে সাহায্য করেছেন অধ্যক্ষ লিটুর শ্বশুর শহিদুল মিয়া। 

শহিদুল মিয়া চৌগাছা উপজেলা আ.লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি। শহিদুল মিয়া সভাপতি থাকাকালীন তরিকুল ইসলাম পৌর কলেজে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল আ.লীগ শাসনামলে অধ্যক্ষের অফিসরুম রিতীমতো আ.লীগের পার্টি অফিস হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। সে সময় লিটু বা তার শ্বশুরের ভয়ে কথা বলার সাহস পায়নি কেউ।

তিনি বলেন, যশোরের কৃতী সন্তান বিএনপির অন্যতম নেতা তরিকুল ইসলামের নাম ভাঙিয়ে অধ্যক্ষ লিটু নিজেকে এখন বিএনপির সমর্থক দেখানোর কাজ চালাচ্ছেন। যেখানে সাহায্য করছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত উপজেলায় ৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। 

এত কম সময়ে হত্যার ঘটনা গত ৫০ বছরে ঘটেনি বলেও জানান তিনি। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ঘটেছে ৪টি অপহরণের ঘটনা। অসংখ্য সংঘর্ষ হয়েছে আওয়ামীগ-বিএনপির মধ্যে। আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা সারা দেশের ভেতর শুধু মাত্র চৌগাছা উপজেলায় দাপটের সঙ্গে শাসন করতেছে বিএনপির একাংশের নেতাদের ছত্রছায়ায়। 

বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. হাসান, লেন্টু নামের এক ব্যবসায়ীর পারিবারিক দণ্ডকে পুঁজি করে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়েছে। বর্তমানে উপজেলার পাইলট স্কুলের খেলার মাঠ দখল করে ভবন নির্মাণের চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। তাদের কারসাজিতে উপজেলায় সরব রয়েছে মাদক  সিন্ডিকেট। আওয়ামী লীগের সময় মাদকের চোরাকারবার যারা করত, তারা টাকার মাধ্যমে এখনো ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে অধ্যক্ষ মনজুরুল ইসলাম লিটু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমার বিষয়ে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলো মিথ্যা। উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা করা হচ্ছে। আমি আ.লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই।  

অন্যদিকে আ.লীগের পুনর্বাসন, অর্থ-বাণিজ্যসহ দখলের বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা সাধারণ সম্পাদক হাসান বলেন , আমি এখনো হাকিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান এবং চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সেক্রেটারি। 

আমি এসব কোনো ধরনের পুনর্বাসন, অর্থ-বাণিজ্য বা দখলের সঙ্গে জড়িত নয়। আমিসহ আমার পরিবার আওয়মী শাসনমালে নির্যাতনের শিকার। তবে উপজেলার অনেক নেতার আত্মীয়-স্বজন আছে আ.লীগ করে তারা তাদের সেল্টার দিতে পারে । আমি কাউকে শেল্টার দিচ্ছি না। 

এ বিষয়ে সভাপতি সালাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমি সাধারণ সম্পাদকের চাঁদাবাজি, দখল বা পুনর্বাসনের বিষয়ে কিছু জানি না। তবে আ.লীগ নেতাদের সঙ্গে তার ছবির বিষয়টি সম্পাদকের ব্যক্তিগত। যদি তার তাদের (আ.লীগ) সঙ্গে তার ছবি বা উঠাবসা থাকে, এ বিষয়ে আমি তো কিছু বলতে পারব না। তাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্কের বিষয়ে আমি জানি না। আ.লীগের নেতারা বিএনপির কোনো সংগঠনে যুক্ত আছে বা হচ্ছে বলে আমার জানা নেই।