ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম: সাবেক ইউএনওসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে কৃষকের মামলা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৫, ০৬:৫৬ পিএম

ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম: সাবেক ইউএনওসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে কৃষকের মামলা

ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

সুনামগঞ্জের শাল্লায় হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এক
কর্মকর্তাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলার শাল্লা উপজেলার খলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক পতাকী রঞ্জন দাস (৬৭) বাদী হয়ে সুনামগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। আদালতের বিচারক মো. হেমায়েত উদ্দিন অভিযোগ আমলে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মল্লিক মো. মঈন উদ্দীন সোহেল।

হাওরে বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে গঠিত উপজেলা কমিটির সভাপতি হচ্ছেন ইউএনও এবং সদস্য সচিব হলেন ওই উপজেলায় দায়িত্বে থাকা পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী।

মামলার আসামিরা হলেন-শাল্লার সাবেক ইউএনও এস এম তারেক সুলতান; শাল্লার দায়িত্বে থাকা পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী রিপন আলী; শাল্লা উপজেলায় হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজের ২২ নম্বর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি মো. হাসিম উদ্দিন, সদস্যসচিব মিনাদুল মিয়া; ৫৮ নম্বর পিআইসির সভাপতি মজনু মিয়া, সদস্যসচিব ফজলুল হক; ২৪ নম্বর পিআইসির সভাপতি কালাম মিয়া, সদস্যসচিব ফজল মিয়া; ৪৫ নম্বর পিআইসির সভাপতি আবদুল কাদির মিয়া, সদস্যসচিব সরাফত আলী; ৭৭ নম্বর পিআইসির সভাপতি কালীপদ দাস, সদস্যসচিব প্রভাত দাস; ৭৮ নম্বর পিআইসির সভাপতি সুজিত চন্দ্র দাস, সদস্যসচিব সমীরণ দাস; ৫৯ নম্বর পিআইসির সভাপতি দীপক চন্দ্র দাস ও সদস্যসচিব পবিত্র মোহন দাস।

মামলার আরজিতে বাদী উল্লেখ করেন, হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের নীতিমালা (কাবিটা) অনুযায়ী স্থানীয় জনগণকে স¤পৃক্ত করে পিআইসির মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য হাওর এলাকায় বাঁধের নিকটবর্তী জমির মালিক ও উপকারভোগীদের সম্পৃক্ততা করে পিআইসি গঠন করার কথা উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা কমিটির সভাপতি ও সদস্যসচিব আবশ্যিকভাবে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এসব পিআইসি গঠন করবেন। গঠিত পিআইসিগুলো ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু করে অবশ্যই ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করবে।

কিন্তু উল্লেখিত অনেক পিআইসির সভাপতি ও সদস্যসচিব সংশ্লিষ্ট বাঁধের পার্শ্ববর্তী জমির মালিক নন, এমনকি উপকারভোগীও নন-এমন লোকজনকে নিয়ে পিআইসি গঠন করেন। উল্লেখিত সব বাঁধের নিকটবর্তী জমির মালিকদের অজ্ঞাত কারণে কোনো কমিটিতেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। উপজেলা কমিটির অন্য সদস্যদের মতামত না নিয়ে আসামিরা একে অপরের যোগসাজশে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে পিআইসিগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এদিকে আজ ২৮ ফেব্রুয়ারী হাওরে বাধেঁর কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার কথা থাকলে হাওর ঘুরে দেখা যায় উপজেলার ভেড়ারডহর এলাকায় ১১৩ নম্বর পিআইসির সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও সেক্রেটারী বাচ্চু মিয়া তারা বাধেঁর গোড়া থেকে মাটি নিয়ে বাধেঁর কাজ করছেন। এই বাঁধের বরাদ্দের পরিমান ২৬ লাখ টাকার উপরে। অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ লুটপাঠেরই অংশ বলে মনে করছেন এই এলাকার কৃষকরা। এছাড়াও ১১২ নম্বর পিআইসির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানের কাজ চলমান রয়েছে।

যার বরাদ্দের পরিমান ২৭ লাখ টাকার উপরে। এই দুটি পিআইসিতে বাধেঁর নামে চলছে লুটপাঠ। তারা সময় কালক্ষেপন করে বাধেঁর কাজ শেষ না করেই টাকা আত্মসাতের পরিকল্পনায় ব্যস্ত রয়েছেন। আনোয়ার হোসেনের ১১৩ নম্বর পিআইসিতে গেলে সাংবাদিকরা এসেছেন জানতে পেরে তিনি তেরে আসেন। এভাবে দিরাই,শাল্লা,তাহিরপুর,শান্তিগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর,দোয়ারাবাজারসহ সবকটি উপজেলার বিভিন্ন হাওরে অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিয়ে সরকারের টাকা অপচয়ের পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ড,উপজেলা প্রশাসন ও এসওরা মিলে লুটপাটের মহোৎসব শুরু করেছে। অধিকাংশ বাঁধে যেখানে মাটি দিয়ে বাধঁ নির্মাণ করার কথা সেখানে বালি দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এমনও দেখা যায় যে পুরাতন বাধেঁর জন্য ও বরাদ্দের পরিমান বেশী। কিন্ত পিআইসিরা এস্কোভেটার দিয়ে পুরাতন বাধঁ থেকে মাটি তুলে এই
বাধেঁই নতুন করে মাটি ফেলা হচ্ছে লোক দেখোনো। সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশা বাঁধের কাজ শেষ হয়নি ,বাধেঁর কাজ শেষ হলে দুম্মুজ দিয়ে লেভেল করার পর বাধেঁর সাইডে ঘাস লাগানোর কথা। কিন্ত কবে বাধেঁর কাজ শেষ হবে এবং ঘাস লাগানো হবে এই নিয়ে শংঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা।

তাছাড়া আগামী কয়েকদিনের মধ্যে যদি বৃষ্টিপাত শুরু হয় তথখন তো কুষকরা তাদের কর্ষ্টাজিত সোনালী ফসল ঘরে তোলা নিয়ে আতংঙ্কে আছেন বলে
অনেকেই আমাদেরকে জানিয়েছেন।

এছাড়া নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে পিআইসি গঠন করে সম্পূর্ণ বাঁধের কাজ না করে সরকারি টাকা আত্মসাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মামলার বাদী পতাকী রঞ্জন দাস জানান, হাওরে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে কৃষকের একমাত্র বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। এই অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই কাজে গাফিলতি হয়। হাওরে আমার অনেক জমি। জমির ফসল নিয়ে আমি চিন্তিত। হাওরের কৃষকদের স্বার্থেই আমি মামলা করেছি।

সুনামগঞ্জ পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময়সীমা ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি। সে অনুয়ায়ী আজ শুক্রবার সময়সীমা শেষ হচ্ছে। জেলায় এবার ১২টি উপজেলার ৫৩টি হাওরে ৬৮৬ প্রকল্পে বাঁধের কাজ হচ্ছে। এ জন্য প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ১২৭ কোটি টাকা।

পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানান, এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৯০ ভাগ। আমরা আরও সাত দিন সময় বাড়ানোর আবেদন করেছি। এই সময়ের মধ্যেই পুরো কাজ শেষ করা হবে।

আরবি/জেডআর

Link copied!