শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫

পরিকল্পনার অভাবে চসিকের ৪ কোটি টাকা গচ্চা

জালালউদ্দিন সাগর, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১১, ২০২৪, ০১:০৯ এএম

পরিকল্পনার অভাবে চসিকের ৪ কোটি টাকা গচ্চা

ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

বিদ্যুৎ খরচ বেশি, তাই নির্মাণের দুই মাসের মাথায় বন্ধ হয়ে গেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর একমাত্র চলন্ত সিঁড়ি (এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজ)। ২০২০ সালে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে জাকির হোসেন সড়কে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালসংলগ্ন মহাসড়কে এই চলন্ত সিঁড়ি নির্মাণ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। গত পাঁচ বছরে চলন্ত সিঁড়ির কলকব্জায় মরীচা ধরাসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে গেলেও চার কোটি টাকার সম্পদ সচল করতে উদ্যোগ নেয়নি চসিক। সচেতন নাগরিক কমিটির নেতারাসহ খোদ চসিকের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বড় মাপের দুর্নীতি করতে অপরিকল্পিতভাবে বসানো হয়েছিল চলন্ত ফুটওভার ব্রিজ।

তবে চসিকের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের তদবির এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এমপি আফছারুল আমীনের অনুরোধের কারণে কোনো সার্ভে ছাড়াই বিপুল অর্থ ব্যয়ে এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের অনুমতি দেন চসিকের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

ডায়াবেটিক হাসপাতলের রোগী ও সাধারণ পথচারীদের পারাপারের জন্য ২০২০ সালে হাসপাতালের সামনে এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করেছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। নির্মাণের পর মাত্র দুই মাস চালু থাকলেও বিদ্যুৎ বিল দিতে না পারার কারণে বন্ধ হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ফুটওভার ব্রিজটি। সময়ের ব্যবধানে পরবর্তী সময়ে এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজের বেশ কিছু যন্ত্রাংশ চুরি করে নিয়ে যায় একটি চক্র।

তবে এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ এবং দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকার পেছনে পরিকল্পনার অভাব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্মাণের আগেই এর রক্ষণাবেক্ষণ ও আনুষঙ্গিক খরচ ভেবে তারপরই এই চলন্ত সিঁড়ি নির্মাণ করা উচিত ছিল বলে মতামত তাদের। তারা মনে করেন, যে জায়গাড চলন্ত সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে চলন্ত ফুটওভার ব্রিজ অপ্রয়োজনীয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের তদবিরের কারণে সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে অপ্রয়োজনীয় এই সেতু নির্মাণ করতে বাধ্য করেছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য আফছারুল আমীন। ডায়াবেটিক রোগীদের অসহায়ত্বের কথা বলে অপ্রয়োজনীয় এই ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে বাধ্য করা হয় চসিককে। যদিও ডায়াবেটিক হাসপাতালে আগত সব রোগীই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে রিকশা কিংবা অটোরিকশা কিংবা নিজস্ব গাড়িতে।

নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, জিইসি কিংবা ইস্পাহানী মোড়ের মতো ব্যস্ততম সড়কে যদি এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হতো, তাহলে এর কার্যকারিতা অনেক বেশি থাকত। অপ্রয়োজনীয় একটি পয়েন্টে এই ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। চলন্ত সেতুর প্রাত্যহিক কিছু ব্যয় আছে। সেগুলো মাথায় রেখে এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজটা সরিয়ে জিইসি কিংবা ইস্পাহানীর মোড়ের মতো ব্যস্ততম সড়কে বসালে অধিক পথচারী ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশিদুল হাসান বলেন, ‘কোনো পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার আগে তার সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ বিল সবকিছু মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। এর জন্য প্রতি অর্থবছরে বরাদ্দও রাখা উচিত। পরিকল্পনা যদি সঠিক না হয়, তাহলে অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হবে না।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশে যেখানে পথচারীরা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে জানে না, সেখানে এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের বিষয়টা পুরোপুরি অযৌক্তিক। কোনো রকম সার্ভে এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া ছাড়াই সে সময় এই প্রজেক্ট করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বড় প্রজেক্ট মানে বড় দুর্নীতি, এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ তারই প্রমাণ।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকতা মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করতে প্রায় ৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এই টাকা আদৌ খরচ হয়েছে কি না, বিষয়টা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একবার ভেবেছিলাম ফুটওভার ব্রিজটা উঠিয়ে অন্য কোথাও বসাব। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানলাম, অনেক যন্ত্রাংশই চুরি হয়ে গেছে। এই ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে কোনো রকম দুর্নীতি হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কার্যকর হবে না জেনেও প্রজেক্ট যখন হাতে নিয়েছে, এর পেছনে দুর্নীতি থাকতেই পারে। তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে নতুন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন স্যারের সাথে আলাপ করেছি। এ বিষয়ে একটা তদন্ত হওয়া দরকার। যোগ করেন তিনি।

আরবি/জেডআর

Link copied!