নগর থেকে সিলেট হয়েছে মহানগরী। তবে সেভাবে বাড়েনি ট্রাফিক সেবা। ভোগান্তি আর হয়রানি পিছু ছাড়ছে না বাসিন্দাদের। নগরীর প্রধান সমস্যা অসহনীয় যানজট। সড়কগুলোয় চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি লেগেই থাকে। অচলাবস্থা শুধু প্রধান সড়কে নয়, তা বিস্তৃত হয়েছে অলিগলি পর্যন্ত। সড়কে অবৈধ যানবাহনের দাপট বেড়েই চলেছে। আর রাস্তার মাঝখানে বাঁশ দিয়ে দেওয়া হয়েছে ডিভাইডার। এবড়োখেবড়ো বাঁশের ডিভাইডারের কারণে বাড়ছে যানজট। দীর্ঘ যানজটের কারণে নগরবাসীকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ দুর্ভোগে প্রতিদিন মানুষের লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
এসব সমস্যা সমাধানে ট্রাফিক পুলিশের নেই কোনো পরিকল্পনা। রাস্তায় গাড়ি আটকানো আরা মামলা প্রদানেই আটকে আছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা।
তবে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, বিপুল পরিমাণ অটোরিকশা (সিএনজি) নগরীতে যানজট সৃষ্টি করছে। কিন্তু পার্কিং নেই। যানজটের অন্যতম কারণ হলো সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) এলাকায় কোনো পার্কিং স্ট্যান্ড না থাকা। শত শত গাড়ি নগরীতে ঢুকছে, কিন্তু পার্কিং করার জায়গা নেই। শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে আমরা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করছি। স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না বলে আমরা অস্থায়ীভাবে বাঁশ দিয়ে ডিভাইডার দিয়েছি।
তিনি আরো বলেন, নগরীতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য অতীতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওইসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। দুঃখজনক হলো, এতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। পুলিশের হাতের ইশারায়ই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে যানবাহন। চালকদের আইন না মানার কারণেও নগরীর যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জহির বিন আলম বলেন, ‘নগরীর এই প্রধান সড়কে এ ধরনের বাঁশের ডিভাইডার উপযোগী না। নগরীর সড়কগুলোতে পরিবহনের চাপসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা না করে বাঁশের ডিভাইডার তৈরি করায় এখন কিছু এলাকায় এর প্রভাবে পরিবহনের জট লেগে যাচ্ছে। এই নগরী আমাদের, তাই নগরীতে সুন্দর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
নগর-পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাফিক পুলিশের অব্যবস্থাপনায় সিলেট মহানগরী এখন যানজটের নগরীতে পরিণত হয়েছে। অদক্ষ ট্রাফিক কর্মকর্তাদের কারণে দীর্ঘদিনেও সিলেট মহানগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আসছে না শৃঙ্খলা এমনটাই মনে করছেন নগরবাসী। মহানগরীর অধিকাংশ রাস্তায় বাঁশ দিয়ে দেওয়া হয়েছে ডিভাইডার। এতে রাস্তাগুলো হয়ে উঠছে বিপজ্জনক। অনেক জায়গায় বাঁশের মাথা বের হয়ে আছে, যা অন্তন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সিলেট নগরীর রোজভিউ পয়েন্ট থেকে সোবহানিঘাট হয়ে বন্দরবাজার কামরান চত্বর যেতে অথবা আসতে হলে আপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের ডিভাইডার থেকে রক্ষা পেতে আতঙ্কে থাকতে হবে।
অপরদিকে নগরীতে সড়কের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় কম। কম সড়কে বেশি যান চলাচলের কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এ নগরীতে বেশির ভাগ যানবাহনই নিয়ম মেনে চলাচল করে না।
অটোরিকশাচালকরা যেখানে-সেখানে যানবাহন থামিয়ে যাত্রী তোলেন ও নামান। আবার কোথাও বা নিজেদের ইচ্ছামতো আড়াআড়ি গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলা হয়। চালকদের আইন না মানার কারণেও নগরীর যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
সিলেট নগরীর জেল রোড এলাকার বাসিন্দা আফসান মাসুদ বলেন, সিলেটের এই রাস্তা যখন পূর্ণ সংস্কার করা হয়, তখন রাস্তার মাঝখানে গাড়ি পারাপারের জন্য অনেক ইউটার্ন ছিল, পরে তা অনেকগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ধোপাদীঘির পাড় শিশু পার্কের সামনে বাঁশ দিয়ে বন্ধ করা মোটেই ঠিক হয়নি। এতে জনগণের ভোগান্তি বাড়ছে। এবং সামনের রাস্তাও বিপজ্জনক হয়েছে। কোর্ট পয়েন্ট থেকে সোবহানিঘাট হয়ে দক্ষিণ সুরমায় যেতে হলে ধোপাদীঘির পাড় শিশু পার্কের সামনে বাঁশ দিয়ে তৈরি করা এসব অযৌক্তিক ডিভাইডারগুলো অপসারণ করা জরুরি। তুলনামূলক সরু এই সড়কে ইউটার্ন নির্মাণের পর দুই পাশের লেনের জায়গা অনেকটা কমে গেছে। এ জন্য এই ইউটার্নও সরু করে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বড় পরিবহনগুলোর টার্ন করতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
নগরীর সুবিদবাজার এলাকার ব্যবসায়ী ফয়সল আহমদ বলেন, সিলেট নগরী অন্য বিভাগীয় নগরীর চেয়ে তুলনামূলক অনেক ছোট। মাত্র ৩ থেকে ৫ কিলোমিটারের আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়েই নগরীর থাকে জমজমাট। নগরীর ধোপাদীঘিরপাড় থেকে সুরমা মার্কেট পয়েন্ট, আর কামরান চত্বর থেকে জিন্দাবাজার পয়েন্ট হয়ে আম্বরখানা। নাইওরপুল পয়েন্ট থেকে জিন্দাবাজার পয়েন্ট হয়ে লামাবাজার পয়েন্টÑ এই হলো নগরীর সবচেয়ে ব্যস্ত এলাকা। এই সামান্য কয়েকটি পয়েন্টের যানজট নিরসনে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ। উল্টো রাস্তায় বাঁশ দিয়ে তৈরি করছে যানজট। সবাই জনগণকে বাঁশ দিতে মজা পায়, তাইতো নগরীর যানজট নিরসনের প্রতিবন্ধকতা দূর না করে বাঁশের পেছনে রয়েছে ট্রাফিক পুলিশ।
তিনি আরো বলেন, ২০০৯ সালে শুরু হওয়া সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) দীর্ঘ ১৫ বছরেও সিলেট মহানগরের জন্য একটি সুন্দর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পারেনি। এটা সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য লজ্জার।
আপনার মতামত লিখুন :