ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’। সেই নব্বই দশক থেকে এখনো জৌলুস ধরে রাখা একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নাম। সেই সময় বিটিভির একাধিক অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা থাকলেও কালের পরিক্রমায় সব হারিয়ে গেলেও ইত্যাদি এখনো দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে দর্শকদের মনের মণিকোঠায়। তাই ইত্যাদি এখন কয়েক প্রজন্মের অনুষ্ঠান।
‘কেউ কেউ অবিরাম চুপি চুপি/চেহারাটা পাল্টে সাজে বহুরূপী’ এই গানটা কানে বাজলেই সবাই সব কাজ ফেলে বসে পড়তেন টিভি সেটের সমানে। কেননা তখন টিভিই ছিল ইত্যাদি দেখার একমাত্র মাধ্যম। অপার মুগ্ধতা নিয়ে দেখতেন হানিফ সংকেতের ইত্যাদি। ইত্যাদি দেখতে বসে সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য করতেন অনেকে। কিন্তু সেই মন্তব্য পৌঁছাত না হানিফ সংকেত কিংবা ইত্যাদির কলাকুশলীদের কাছে। কেউ কেউ বিটিভিতে চিঠি লিখে জানাতেন তাদের মতামত।
দিন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে বাংলা সংস্কৃতির। সেই সঙ্গে উন্মুক্ত হয়েছে একাধিক মাধ্যম। টেলিভিশনের সেটে তো বটেই তার সঙ্গে আরও একাধিক মাধ্যমে দর্শক দেখতে পান তাদের প্রিয় অনুষ্ঠান ইত্যাদি। জানাতে পারেন তাদের মতামত।
কেমন হলো এবারে ঈদুল ফিতরের ইত্যাদি? এই প্রশ্নের উত্তর একটাই, অসাধারণ। বরাবরের মতো এবারও ইত্যাদি দেখে অপার মুগ্ধতায় ডুবে গেছেন দর্শক। ঈদের পরদিন বিটিভির সামনে বসে যেমন দর্শক মুগ্ধ হয়েছেন তেমনি ইউটিউবে প্রচারের পরও হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন।
শুক্রবার এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইউটিউবে ইত্যাদির দর্শক ছিল ৫১ লাখ ৫২ হাজোরেরও বেশি। এক ঘণ্টা এগারো মিনিটের এই অনুষ্ঠানটি দেখে মন্তব্য করেছেন প্রায় ৫ হাজার ৬শজন। ইউটিউবের ট্রেন্ডিং তালিকায় আছে ৬ নম্বরে।
কি ছিল ইত্যাদিতে
বরাবরের মতো এবারও ইত্যাদি শুরু করা হয়েছে- আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ এই গানটি দিয়ে। এবারে গানটি পরিবেশন করেন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। গানটির সংগীতায়োজন করেছেন মেহেদী।
এবারের ঈদের বিশেষ ইত্যাদির চমকানো সব বিষয়ের মধ্যে একটি বিশেষ পর্ব হচ্ছে দেশাত্মবোধক গান। এবারের ঈদ ইত্যাদির ‘দেশের গানটি’তে কণ্ঠ দিয়েছেন নন্দিত শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী ও সাবিনা ইয়াসমিন। আর তাদের সঙ্গে রয়েছে এই প্রজন্মের দশজন জনপ্রিয় শিল্পী।
বিশেষ চমক হিসেবে ছিল জনপ্রিয় দুই সংগীত তারকা হাবিব ওয়াহিদ ও প্রীতম হাসানকে একসঙ্গে উপস্থাপন। যা অনুষ্ঠানে ভিন্ন এক মাত্র যোগ করেছে।
আর একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন জনপ্রিয় ঢালিউড অভিনেতা সিয়াম আহমেদ এবং ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি। এই গানটিও একটি বড় চমক হিসেবে থাকতে পারত। যেমনটা গত ঈদে তাহসান ও তাসনিয়া ফারিণের গানে হয়েছিল।
তাই হিমি এবং সিয়ামের গানটি নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা একটু বেশিই ছিল, যা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবারের ইত্যাদি। এবারে গানটিতে যেন প্রাণ নেই। নেই কথার গভীরতা। তাই হিমি ও সিয়ামের গান হতাশ করেছে দর্শকদের।
অন্যদিকে সাফা কবির, সাদিয়া আয়মান, সামিরা খান মাহি ও পারসা ইভানার নাচ ছিল মনোমুগ্ধকর। ফজলুর রহমান বাবুর মিউজিক্যাল ড্রামা দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে। যেমনটা দিয়েছে শহীদুজ্জামান সেলিম-রোজী সিদ্দিকী, এফ এস নাঈম-নাদিয়া আহমেদ, ইন্তেখাব দিনার ও বিজরী বরকতউল্লাহ দম্পতিদের নিয়ে আয়োজন।
ইত্যাদি বরাবরই বিনোদনের মাধ্যমে চেষ্টা করে সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিতে। সমসাময়িক অসংগতি তুলে ধরে সব সময়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রতিটি নাটিকাতেই ছিল সেই ধারা, যা দর্শকদের মগ্ন করে রেখেছে। ইত্যাদির ঈদ আয়োজনের আরেক চমক বিদেশিদের নিয়ে পর্ব।
বিদেশিদের নিয়ে এবারের বিষয় ছিল ‘গুজব’। নাচ-গান ও গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তুখোড় অভিনয় সমৃদ্ধ পর্বটি দর্শকদের যেমন আন্দোলিত করেছে তেমনি ভাসিয়েছে মুগ্ধতায়।
দর্শকদের নিয়ে পর্বের এবার চমক ছিল অভিনেতা নাসির উদ্দিন খান। তবে পর্বটি আরও একটু জমজমাট করা যেতেই পারত। দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নানি আর নাতি এবারও দিয়েছেন ঝলকানী।
সবমিলে কিছু অসঙ্গতি ছাড়া এবারের ইত্যাদি ছিল দর্শকরের প্রধান বিনোদনের মাধ্যম। হাসি আনন্দে ইত্যাদি সমাজের অসংলগ্নতা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে বরাবরের মতোই।
আপনার মতামত লিখুন :