বাংলাদেশের সংগীতের স্বর্ণালী সময়ের একজন সংগীতযোদ্ধা বলা হয় ইথুন বাবুকে। শুরুর দিকে শিল্পী হিসেবে তাকে শ্রোতারা চিনলেও পরবর্তীতে তিনি হয়ে উঠেন বাংলা গানের জগতে অন্যতম জনপ্রিয় গীতিকার ও সুরকার! তার লেখা অসংখ্য গান সেই সময়ে আলোড়ন তুলেছে দেশব্যাপী। এখনো নিয়মিত গান করছেন তিনি। রয়েছেন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা- জাসাসে সক্রিয়। বিএনপির রাজনীতি করায় দীর্ঘ ১৫ বছর তিনি ছিলেন বিটিভির কালো তালিকায়। বিভিন্নভাবে হয়েছেন নিপীড়নের শিকার। তবুও পিছু হাঁটেননি তিনি। দীর্ঘ সংগ্রামের পর পেলেন কাঙ্খিত বিজয়। সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গে আনন্দ আড্ডার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ গানের স্রষ্টা ইথুন বাবু বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫ বছর রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। আমাদের আগামীর রাষ্ট্রনায়ক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ছিলাম, আছি এবং থাকব। এই রাজপথের সংগ্রাম দমাতে স্বৈরাচারী ও খুনি হাসিনা অনেক চেষ্টা করেছে। বিগত ১৫ বছরে জুলুম অত্যাচার কম হয়নি। তাদের হাত থেকে পরিবারও রেহাই পায়নি। ছাত্র-জনতা এক হয়ে সংগ্রাম করে স্বৈরাচার হটিয়েছি। ১৫ বছরের চেষ্টায় অবশেষে আমরা সফল।’
প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আমি উচ্চ পর্যায়ের সংগীত পরিচালক ও সুরকার হলেও ১৬ বছর কেনো কাজ করতে পারিনি। যা আমাকে অবাক করে। যারা এই দীর্ঘ সময় বিটিভির সুবিধা নিয়েছে তারাই আবার সরকার পতনের পর দেখলাম স্বাধীনতা চেয়ে দাঁড়িয়েছে। যা খুবই হাস্যকার। আমাকে কালো তালিকায় রাখার জন্য ইন্ডাস্ট্রির লোকজন জড়িত ছিল। ওরা কুকুর। কেন ১৫ বছর আমার বিটিভির পথ বন্ধ ছিল তাদের কাছে প্রশ্ন রইল।’
ইথুন বাবু মনে করেন ভালোকে ভালো এবং খারাপকে খারাপ বলতে হবে। সেটা যেই হোক না কেন। সেই সঙ্গে বললেন, ‘বিটিভি করে কিছু হবে না। সব জায়গায় স্বৈরাচারীর লোক বসে আছে। যতক্ষণ তাদের প্রতিহত না করা যাবে ততক্ষণ ষড়যন্ত্র হবেই।’
এসময় তিনি কথা বলেছেন আলোচিত ‘আলো আসবেই’ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ নিয়েও। শিল্পীদের নিষ্ঠুরতায় অবাক হয়েছেন তিনি। এ নিয়ে বলেন, ‘একজন শিল্পী কতটা নিষ্ঠুর হলে শিক্ষার্থীদের ওপর ‘গরম পানি’ ঢেলে দিতে বলেন। স্বৈরাচারের সঙ্গে মিশতে মিশতে তাদের মন-মানসিকতা স্বৈরাচার হয়ে গেছে। গরম পানির চিন্তা মাথায় কিভাবে আসে।’
হাসিনা সরকার লুট করে দেশটাকে শেষ করে দিয়েছে জানিয়ে ইথুন বাবু বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশটার যখন দায়িত্ব নিয়েছে তখন স্বৈরাচারীরা বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। যদিও তাদের কয়েকটি চেষ্টা এরই মধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। তারা বর্তমান সরকারকে ঠিকমতো কাজ করতে না দেওয়ার জন্য এই ষড়যন্ত্র। সরকার সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। যেখানে সবাই ঠিকমতো জীবন-যাপন করতে পারে। বর্তমান সরকারের কাছে আহ্বান রাখব মাদক ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা নেওয়ার জন্য।’
আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শেখ সেলিমের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন ঢালিউডের বিতর্কিত নায়িকা নিপুণ আক্তার। তাকে নায়িকা করে প্রযোজক, চিত্রনায়ক ও বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের সভাপতি হেলাল খান দলটির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বায়োপিক তৈরি করেছিলেন। পরিচালনায় কিংবদন্তি গীতিকার-প্রযোজক ও পরিচালক গাজী মাজহারুল আনোয়ার। ‘আপসহীন’ নামের সিনেমাটিতে খালেদা জিয়ার চরিত্রে অভিনয় করেন নিপুণ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন করে ১৩ বছর আগের সেই সিনেমা আলোচনায় আসে। যদিও ‘আপসহীন’ সিনেমা বন্ধে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছে খালেদা জিয়ার আইনজীবী।
বিস্ফোরক মন্তব্য করে এ নিয়ে ইথুন বাবু বলেন, ‘অনুমতি ছাড়াই হেলাল খান ‘আপসহীন’ বানিয়েছে। যেটা নিয়ে তোলপাড় চলছে। এই হেলাল খান ওয়ান-ইলেভেনের দালাল। এরই মধ্যে সিনেমাটি বন্ধে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছে। শুনেছি, নিপুণের কাছ থেকে অনেক টাকা নিয়ে এফডিসিতে হট্টগোল করার চেষ্টা করছে হেলাল খান। চাটুকারিতা এখানো হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রিতে এরকম রাঘববোয়ালরা এখনো আছে। এদের প্রতিহত করতেই হবে। সে কাজটি ঠিক করেনি। এ জন্য তার শাস্তি হতে পারে। দল এ নিয়ে ভাবছে। তার বিতর্কিত কার্যক্রম এখনো চলমান। তার পেছনে আওয়ামী লীগের লোকজন রয়েছে। এদের ধরে আইনের আওতায় আনা দরকার। এদের আমরা চিহ্নিত করছি।’
গত ১ বছরে বিএনপির জন্য ইথুন বাবু ৩৯টি গান করেছেন। যা বিভিন্ন সময় সমাবেশে প্রচারিত হয়েছে। এরই মধ্যে তার লেখা ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ গানটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি অন্য একজন শিল্পী এর গায়িকা দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এবং ইথুন বাবুকে প্রতারক বলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইথুন বাবু বলেন, ‘যে গান গাইতে পারে না তাকে দিয়ে জোর করে গান গাওয়ানো যায় না। তারা যখন রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে ঘুরবে তখন মানুষ দেখবে। আমাকে প্রতারক বলায় রুকসার রহমান সহ জড়িতদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা হচ্ছে। রোববার তাদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হচ্ছে। ধারণা করছি এই মেয়ের পেছনে অন্য লোকের ষড়যন্ত্র রয়েছে। গানটি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। দ্রুতই তাদের চিহিৃত করে আইনের আশ্রয় নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আলোচনায় আসা ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ এই গানের আদলে আসামের ভাষায় গানটি গেয়ে ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছেন এক শিল্পী। এই গানের জন্য আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। মৌসুমীকে ধরার জন্য প্রচুর চেষ্টা করেছিল। তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।’
জানালেন, গান কিভাবে হিট করতে হয় এবং কোন শিল্পীকে দিয়ে কি গান করাতে হয় আমি একটু হলেও বুঝি। কার ধারা গান হবে আর হবে না সেটাও বুঝি। কাউকে নিয়ে মন্তব্য করলেও প্রমাণ থাকতে হয়। যখন আসিফকে দিয়ে ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ করি তখন ওকে বলেছিলাম—এই গানের পর আর পিছু ফিরে তাকাতে হবে না। যেমন বলেছি তেমনই হয়েছে। গানটি পলাশ ও এন্ড্রু কিশোরের গাওয়ার কথা ছিল। আসিফ আকবর ভালো পারবেন বলেই ওকে দিয়ে করিয়েছিলাম। আজ আসিফ বাংলা গানের যুবরাজের খ্যাতি পেয়েছে।
সর্বশেষে তিনি বলেন, ‘চমৎকার একটি বাংলাদেশ চাই। যে বাংলাদেশের জন্য মানুষ দীর্ঘ ১৫ বছর অপেক্ষা করেছিল। দুর্নীতি ও সন্ত্রাস মুক্ত দেশ চাই। বন্যার্তদের পাশে যেভাবে সব শ্রেণির মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তাদেই বোঝা যায় তারা কেমন বাংলাদেশ চায়। এখন সবাই এক। এটাই তো আমার বাংলাদেশ। এই সুন্দর বাংলাদেশই চেয়েছিলাম। যেখানে থাকবে কথা বলার স্বাধীনতা। চিটার বাটপার ছাঁটাই করতে হবে।’
ইথুন বাবুর কথা-সুর ও সংগীতে জনপ্রিয় অ্যালবামগুলোর মধ্যে ‘মনে রেখো’, ‘ঘুম আসে না’, ‘প্রিয়া কাছে নেই’, ‘চন্দনা’, ‘প্রিয়া তোমার মন বলে কিছু নেই’, ‘ক্ষমা করে দিও’, ‘বড় ব্যথা দিলে অঞ্জনা’, ‘মনে মনে মন’, ‘সে ছিল আমার প্রিয়তমা’, ‘বিরহের প্রেম’, ‘মন নদী’, ‘সুখে থেকে ভাল থেকো’, ‘মাধবী দু:খ দিবে কতো’, ‘পরাণ’, ‘এক ফালি রোদ’ উল্লেখযোগ্য।
আপনার মতামত লিখুন :