জৌলুস হারিয়েছে লিটল ম্যাগাজিন

এফ এ শাহেদ

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৫, ০৯:৪৪ এএম

জৌলুস হারিয়েছে লিটল ম্যাগাজিন

ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

অমর একুশে বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চের কাছেই লিটল ম্যাগাজিনের স্টল। তার পাশেই হরেক রকমের দোকানের পসরা নিয়ে বসেছেন ভ্রাম্যমাণ দোকানিরা। প্রথমে বোঝার উপায়ই নেই এটি বইমেলার প্রবেশদ্বার। প্রকাশকেরা বলছেন, পাঠকের মূল স্রোত কখনোই এদিকে তেমন আসে না। 

যারা আসেন, বেশির ভাগের উদ্দেশ্য এখানকার বেঞ্চিতে একটু জিরিয়ে নেওয়া বা ছবি তোলা। প্রতিষ্ঠান ও প্রথাবিরোধী সাহিত্যচর্চার প্রাঙ্গণ ছোট কাগজে একেবারে সাধারণ পাঠকের আগ্রহ আগের থেকে বেশ কম। তবে তাদের ছোট হলেও প্রাণবন্ত এবং উৎসুক একটি পাঠকশ্রেণি ছিল বরাবরই।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, বইমেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও একেবারেই ভিন্ন চিত্র এখানে। এবার লিটলম্যাগ চত্বরে ১৩০টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর প্রায় অধিকাংশ স্টল এখনো খোলাই হয়নি। আবার যেসব স্টল খোলা হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশতেই নেই লিটলম্যাগের নতুন সংখ্যা। অনেক স্টলেই বিভিন্ন প্রকাশনীর বই বিক্রি করতে দেখা গেছে।

কবিতা সংক্রান্তির উপদেষ্টা সম্পাদক রনজু রাইম জানান, ছোট কাগজ সাহিত্যের একটি শক্তিশালী ধারা। তরুণেরা অনেক কষ্ট করে পকেটের পয়সা খরচ করে এগুলো বের করেন। তবে মেলায় প্রতিবছর এমনভাবে একে উপস্থাপন করা হয় যে, বাইরের একটা কিছু মনে করা হয়। পাঠকের মূল স্রোতের বাইরে থেকে যায় বরাবরই।

আমাদের মনে রাখতে হবে, অনেক প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিক ছোট কাগজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছেন। তাই মেলার মূল অংশের মধ্যেই ছোট কাগজের স্থান হওয়া উচিত। তা না হলে সব ধরনের পাঠক-দর্শনার্থী এ সম্পর্কে জানবে না।

নতুন সংখ্যা নেই কেন- এমন প্রশ্নে থিয়েটার-বিষয়ক পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’র নির্বাহী সম্পাদক অপু মেহেদী বলেন, ‘আমরা মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে একটা বিশেষ সংখ্যার কাজ করছি। এটি গুছিয়ে নিতে সময় লাগছে। মেলার পরপরই সংখ্যাটি আনতে পারব বলে আশা করছি। 

বইমেলা শুধু বাংলা একাডেমিতে যখন হতো, তখন ‘বহেড়াতলা’ নামে পরিচিত একটি জায়গা ছিল ছোট কাগজের ঠিকানা। প্রাঙ্গণটি ঘিরে তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের বেশ আড্ডা জমত তখন। এবারের মেলায় ছোট কাগজ এলাকায় আড্ডা তেমন জমেনি। 

বিপণনকর্মী জামাল বললেন, এবারের বইমেলায় পাঠক-ক্রেতার ভিড় তেমন নেই। মাস শেষের দিকে আর মাত্র কয়েক দিন, তবু জমে ওঠেনি এই চত্বর। এমনকি এদিকে কবি-সাহিত্যিকেরাও কম আসছেন।

গতকাল ২৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার অমর একুশে বইমেলা ২৫-এর পঁচিশতম দিনে মেলা শুরু হয় বিকেল ৩টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত, এদিন নতুন বই আসে ১০১টি। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জুলাই অভ্যুত্থান : গ্রাফিতি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মুনেম ওয়াসিফ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন তাসলিমা আখতার ও কামার আহমাদ সাইমন। সভাপতিত্ব করেন ফারুক ওয়াসিফ।

আলোচকেরা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেওয়ালে আঁকা গ্রাফিতি ও চিত্রগুলো শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রকেই নয়, বরং শিল্পের প্রতিষ্ঠিত সংজ্ঞা ও ভাষাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে। মানুষের সহজাত ভাষা, চিন্তা ও সমষ্টিগত আবেগকে ধারণ করে এসব গ্রাফিতি হয়ে উঠেছে অভ্যুত্থানের অন্যতম শক্তিশালী প্রকাশমাধ্যম। 

গণঅভ্যুত্থানের সময় গ্রাফিতির ভাষা, শ্লেষ ও ক্ষোভ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে এবং ছাত্র, তরুণ, শ্রমিক ও সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। 

এ ছাড়া ‘লেখক বলছি’ মঞ্চে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি ও সম্পাদক শওকত হোসেন এবং কবি শামীমা চৌধুরী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন মতিন বৈরাগী, শহীদুল্লাহ ফরায়জী, সুহিতা সুলতানা, শওকত হোসেন, কামাল মুস্তাফা ও মীর তারিকুল ইসলাম। 

আজ ছিল শায়লা আহমেদের পরিচালনায় আবৃত্তি সংগঠন ‘নজরুল আবৃত্তি সংসদ’ এবং রবিউল আল রবির পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘নটনন্দন’-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী রোজী আক্তার শেফালী, অন্তর সরকার, মনীন্দ্র দাস, ফকির আবুল হাশেম, শাহ আলম দেওয়ান, দেলোয়ার হোসেন বয়াতি, শিপ্রা ঘোষ, সনৎ কুমার বিশ্বাস, লুৎফর রহমান, রবিউল ইসলাম, মিন্টু বাউল, বিজন চন্দ্র রায় ও আবদুল আউয়াল।

গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার ২০২৫ ঘোষণা
অমর একুশে বইমেলা ২০২৫ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা, মুনীর চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই ও শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কারপ্রাপ্তদের নামের তালিকা ঘোষণা করেছে বাংলা একাডেমি। 

২০২৪ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিকসংখ্যক বই প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথাপ্রকাশকে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার-২০২৫, একই বছরে প্রকাশিত বইয়ের মধ্য থেকে গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা বইয়ের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পাঠক সমাবেশ (প্লেটো : জীবন ও দর্শন-আমিনুল ইসলাম ভুইয়া), ঐতিহ্য (ভাষাশহিদ আবুল বরকত : নেপথ্য-কথা- বদরুদ্দোজা হারুন) এবং কথাপ্রকাশকে (গোরস্তানের পদ্য: স্মৃতি ও জীবনস্বপ্নÑসিরাজ সালেকীন) মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৫ প্রদান করা হলো। 

এছাড়া ২০২৪ সালে গুণমান বিচারে সর্বাধিকসংখ্যক শিশুতোষ বই প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কাকাতুয়াকে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার ২০২৫ প্রদান এবং এবারের বইমেলায় নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাকতাবাতুল ইসলাম (১ ইউনিট); গ্রন্থিক প্রকাশন (২-৪ ইউনিট) ও বাতিঘরকে (প্যাভেলিয়ন) কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৫ প্রদান করা হয়।

আজকের আয়োজন: আজ বুধবার বইমেলা ২০২৫-এর ২৬তম দিন। মেলা শুরু হবে বিকেল ৩টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশ বিনির্মাণ: শিক্ষা ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সামিনা লুৎফা নিত্রা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন কল্লোল মোস্তফা ও এহ্সান মাহমুদ। সভাপতিত্ব করবেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!