দেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রাম। কৃষিনির্ভর এ জেলার মানুষ সারাবছর এ জনপদের উর্বর জমিতে বিভিন্ন ফসল চাষ করেন। প্রচলিত ফসল হিসেবে ধান, পাট, গম, সরিষা, ভুট্টা, আলুসহ বিভিন্ন শাক-সবজি আবাদ করতে দেখা যায়। এসব ফসল চাষাবাদে কখনো লাভ কখনো লোকসান গুনতে হয় কৃষকদের।
লাভ কিংবা লোকসান যাই হোক চাষাবাদ বাদ দেওয়ার জো নেই তাদের। কেননা কৃষিকেই আঁকড়ে ধরেই সচল রাখতে হয় জীবন জীবিকার চাকা। তবে এবার এক কৃষক প্রচলিত ফসল আবাদের পরিবর্তে প্রথমবারের মতো চাষ করেছেন বিটরুট। পুষ্টি ও ঔষধিগুণ সম্পন্ন সবজি বিটরুট চাষে সফলও হয়েছেন তিনি। তার সুপারফুড বিটরুট চাষের সফলতা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। কুড়িগ্রামে সুপার ফুড বিটরুট চাষাবাদের পেছনে রয়েছে আর এক কাহিনী।
জেলার উলিপুর উপজেলার ধরণীবাড়ি ইউনিয়নের পণ্ডিতপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে সাইদুর রহমান সজিব। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরে সরকারি এ ব্যাংক কর্মকর্তার সংসারে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কমতি ছিল না। তবে এই সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি তার। বড় বোনের শরীরে বাসা বাঁধে মরণব্যাধি ক্যান্সার। বোনের চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান ভারতের মুম্বাই শহরে। নামকরা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে শুরু করেন বোনের চিকিৎসা।
সেখানে ক্যানসারের ওষুধের পাশাপাশি চিকিৎসক রোগীকে পথ্য হিসেবে বিটরুট খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু দেশে ফিরে বোনের পথ্য যোগাতে হিমশিম খেতে হয় সজীবকে। উপজেলা, জেলাসহ বিভাগীয় শহরে হন্যে হয়ে খুঁজেও চাহিদা মতো পুষ্টি ও ঔষধিগুণ সম্পন্ন বিটরুট জোগাড় করতে ব্যর্থ হন। এদিকে দিনে দিনে সজিবের বোনের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। কিছুদিন পরে মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধে হার মানেন সজিবের বোন। পাড়ি জামান না ফেরার দেশে। সেই থেকে সজীবের মনে বিটরুট চাষাবাদের প্রবল জেদ চেপে বসে। তার মতো আর কোনো ভাইকে যেন বোনের জন্য পথ্য জোগাতে হিমশিম খেতে না হয় সেজন্য বিটরুট চাষের সিদ্ধান্ত নেন।
খুঁজতে শুরু করেন বিটরুটের বীজ। পরে নিকট আত্মীয়ের সহযোগিতায় ভারতের শিলিগুড়ি থেকে জোগাড় করতে সক্ষম হন কাঙ্ক্ষিত বিটরুটের বীজ। নিজের ২৫ শতাংশ জমিতে হাল চাষ করে বীজ বপন করেন। বপনের কয়েকদিন পর জমিতে বীজ থেকে চারা গজায়। চারা গজালেও খেতের পরিচর্যায় বিপাকে পড়েন তিনি। কেননা বিটরুট চাষের কোনো অভিজ্ঞতা নেই তার। পরে ইউটিউব দেখে দেখে খেতের পরিচর্যা করতে থাকেন। পাশাপাশি খেতের পরিচর্যায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে পাশে দাঁড়ায় উপজেলা কৃষি বিভাগ। অবশেষে দূর হয়ে যায় সব শঙ্কা। নিবিড় পরিচর্যায় খেতে বেড়ে ওঠে বিটরুট। তার খেতের বিটরুটের গাছ দেখতে অনেকটা পালং শাকের মতো হলেও এর রঙে ভিন্নতা আছে। পাতা সবুজ ও লালচে ধরনের। নিচের মূল অংশটি দেখতে গাঢ় গোলাপি বা লালচে বেগুনি রঙের।
বিভিন্ন পুষ্টি ও ওষুধিগুণ সম্পন্ন এ সবজিকে সুপারফুডও বলা হয়। তার এ বিটরুট খেত এলাকার মানুষের মাঝে সাড়া ফেলেছে। প্রতিদিনই স্থানীয় কৃষকেরা খেত দেখতে আসছেন। চাষের পদ্ধতি জানতে চাচ্ছেন। আগামীতে আবাদের আগ্রহ প্রকাশ করছেন অনেকে। সাইদুর রহমান সজীব বলেন, ‘২৫ শতক জমিতে বিটরুট চাষ করেছি। আমার ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। জমি থেকে ২০০ কেজি বিটরুট তুলে বিক্রি করেছি। জমিতে এখনো প্রায় ১ হাজার কেজি বিটরুট আছে। গড়ে প্রতিটি বিটরুটের ওজন ২০০-৪০০ গ্রাম। প্রতিকেজি ৮০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা দামে বিটরুট বিক্রি করছি। আশা করছি ৮০-৯০ হাজার টাকার মুনাফা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুষ্ঠিকর ও ঔষধিগুণ সম্পন্ন বিটরুট চাষাবাদ অত্যন্ত লাভজনক। এর চাষ পদ্ধতিও খুব কঠিন নয়। এখানকার মাটি বিটরুট চাষের উপযোগী। যার ফলে আমি সফলতা পেয়েছি। আমি চাই এলাকায় এই লাভজনক সবজি চাষ বিস্তার লাভ করুক। আমি সরকারি চাকরি করি তারপরও আগ্রহী কৃষকেরা যদি আমার কাছে পরামর্শ চায় আমি সাধ্যমতো তাদের সহযোগিতা করব।
পাশাপাশি এ সুপার ফুড সবজির চাষ কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা কামনা করছি।’ বিটরুট চাষের সাফল্য দেখে উৎসাহী একই গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বার, আহাম্মদ আলী, গোলাম রব্বানী, ইসমাইল হোসেন ও একাব্বর আলী বলেন, ‘আমাদের এলাকায় প্রথমবার বিটরুট চাষ করে সজীব সবাইকে তাক লাগিয়েছে। তার খেতে ভালো ফলন হয়েছে। এই সবজির প্রচুর চাহিদা।
খেতের সবজি পাইকাররা এসে খেত থেকেই কিনে নিয়ে যাচ্ছে। দামও মোটামুটি ভালো। এই ফসল আবাদ করে লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা নাই। কৃষি অফিস থেকে বীজ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেলে আমরাও আগামীতে বিটরুট চাষ করবো।’ উলিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, উলিপুরে সাইদুর রহমান সজীব বিটরুট চাষ করে সফল হওয়ায় তাকে অভিনন্দন। তার মাধ্যমে কৃষিতে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে। নতুন নতুন ফসলের আবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমরা ধারাবাহিকভাবে কাজ করছি। আগামীতে বিটরুট চাষে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’