গত ২০ জানুয়ারি ঢাকার পল্লবীতে মঞ্জুরুল ইসলাম ওরফে বাবু নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার পর পুলিশ জানায়, চিহ্নিত ‘সন্ত্রাসী’ বাবু ‘ব্লেড বাবু’ নামে পরিচিত ছিলেন। আর এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ঢাকার আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সুমন শিকদার ওরফে মুসার নাম এসেছে।
২০২২ সালের ২৪ মার্চ মতিঝিলে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপুকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত মুসা পালিয়ে গিয়েছিলেন ওমানে। সেখান থেকে ওই বছরেরই ৯ জুন তাকে ফিরিয়ে আনে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। মুসাকে টিপু হত্যার ‘অন্যতম পরিকল্পনাকারী’ বলে অভিহিত করেছিল ডিবি।
ক্ষমতার পালাবদলের পাঁচ মাসের মাথায় গত ৩ জানুয়ারি জামিনে বের হন মুসা, এর কিছুদিন পরেই পল্লবীর হত্যাকাণ্ডে আবারও তার ‘সংশ্লিষ্টতার’ কথা জানায় পুলিশ।
পল্লবী এলাকার আধিপত্য বিস্তারের জেরে শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান ওরফে মামুন গ্রুপের সঙ্গে মুসা গ্রুপের ‘দ্বন্দ্বের’ জেরে খুন হন বাবু। ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত তালিকার ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর দুজন প্রকাশ-বিকাশের সহযোগী ছিলেন মুসা।
ডিবির মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) সোনাহর আলী শরীফ গণমাধ্যমকে বলেন, “এ হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দেয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে।”
গত ১০ জানুয়ারি ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে ‘মাল্টিপ্লান সেন্টারের’ সামনে কম্পিউটার ব্যবসায়ী এহতেসামুল হক ও ওয়াহিদুল হাসান দিপুকে ১০-১২ জনের একটি দল এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করে। এ ঘটনায় এলিফ্যান্ট রোড কম্পিউটার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি ওয়াহিদুল হাসান দিপু ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমনসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ ও অচেনা আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করে নিউ মার্কেট থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিরা ৫ অগাস্টের পর বিভিন্ন সময়ে মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করতেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবসায়ীদের ভয়-ভীতি ও হুমকি দিত।
ইমন গত ১৬ অগাস্ট জামিনে মুক্তি পান। তার একদিন আগেই দুই যুগ পর জামিনে বের হয়ে আসেন আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, যিনি গত ১০ জানুয়ারির হামলায় আহত দিপুর আপন ভাই।
এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত ২৪ জানুয়ারি ঢাকার ৩০০ ফিট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ হোসাইন মিথুনকে। তাকে নিয়ে নিউ মার্কেট থানার সামনে পৌঁছালে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে তার অর্ধশতাধিক অনুসারী।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পৃথক মামলায় ৭ জনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানিয়েছে, ছাত্রদল নেতা মিথুন সন্ত্রাসী ইমনের অনুসারী। যিনি ইমনের হয়ে ধানমন্ডি এলাকার চাঁদাবাজির অর্থ আদায় করতেন। ইমন বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও এলাকায় ‘আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে’ কেন্দ্র করে পিচ্চি হেলাল ও ইমন গ্রুপের দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ মাল্টিপ্লান সেন্টারের সামনের ওই ঘটনা।
নিউ মার্কেট থানার ওসি মোহসিন উদ্দিন বলেন, “মিথুনকে গ্রেপ্তার করে থানায় আনার পর পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায়ও অনেকে পুলিশের জালে রয়েছে।”
এছাড়া, ১৯ বছর পর গত ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন সরকারের তালিকায় থাকা আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম। সরকার বদলের পর কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছেন মিরপুরের আব্বাস আলী, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন ও খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু। কারাগারে থেকেই বিভিন্ন এলাকার ‘আন্ডার ওয়ার্ল্ড’ নিয়ন্ত্রণ করে আসা তাদের অনেকেই জামিনে বেরিয়ে পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাচ্ছি। জেল থেকে বের হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নানা ধরনের অপকর্মে জড়াচ্ছেন। আমরা জামিন বাতিলের জন্য আবেদন করব।”
এ ধরনের অপরাধীদের জামিনের বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে বলেন, “এটাই আমাদের আশঙ্কার বিষয়। আইনগতভাবে যত কথাই বলুক, ঢালাওভাবে জামিন দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
“সামাজিকভাবে জননিরাপত্তায় কী সমস্যা তৈরি হতে পারে যাচাই-বাছাই করে এ ধরনের অপরাধীকে জামিনে মুক্তি দেওয়া উচিত ছিল।”
আপনার মতামত লিখুন :