বাংলাদেশের ট্রাভেল এজেন্সি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। প্রথমবারের মতো একটি পরিপত্রের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। যা দেশের এয়ার টিকিট বিক্রির প্রচলিত ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা দিতে পারে।
পরিপত্রের খসড়া অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো ট্রাভেল এজেন্সি আরেক ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে এয়ার টিকিট বিক্রি করতে পারবে না। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে গ্রাহক হয়রানি বন্ধ করা ও ব্যবসায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। তবে এর বিরোধিতা করছেন দেশের অনেক ট্রাভেল এজেন্সি মালিক, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা।
কী এমন সমস্যা?
বিশ্বব্যাপী ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায় ‘এজেন্ট টু এজেন্ট’ (B2B) মডেল দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। এর মাধ্যমে এক ট্রাভেল এজেন্সি অন্য এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট বিক্রি ও ক্রয় করে। কিন্তু বাংলাদেশে যদি এই নিয়ম বন্ধ করা হয়, তবে দেশে বহু ছোট এবং মাঝারি আকারের ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা পরিচালনা করা বন্ধ করে দিতে পারে।
এসব এজেন্সি যদি অন্য এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহ করতে না পারে, তবে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
আইএটিএ সদস্যপদ: বাধ্যতামূলক নয়?
নতুন পরিপত্রে বলা হয়েছে, ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য অবশ্যই আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) থেকে সদস্যপদ নিতে হবে। বর্তমানে, দেশে ৫,৭৪৬টি লাইসেন্সধারী ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে, এর মধ্যে মাত্র ৯৭০টি এজেন্সি আইএটিএ অনুমোদিত।
আইএটিএ সদস্যপদ গ্রহণের জন্য ৩০ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি প্রয়োজন, যা অধিকাংশ ছোট এজেন্সির পক্ষে সম্ভব নয়। এর ফলে, তারা বড় এয়ারলাইন্সের টিকিট বিক্রি করতে পারবে না এবং ব্যবসা পরিচালনা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
ব্যবসায়ীরা কী বলছেন?
এ বিষয়ে ট্রাভেল এজেন্সির মালিকরা জানিয়েছেন, নতুন পরিপত্র কার্যকর হলে, ছোট এজেন্সিগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। ‘বড় এজেন্সিগুলো বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে এবং ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকিট সংগ্রহের সুযোগ হারাবে,’ বলছেন মঈন ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী মো. গোফরান চৌধুরী।
তিনি আরও বলেন, ‘যদি এই পরিপত্র কার্যকর হয়, তবে একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে, যা বিদেশি এজেন্টরা গ্রহণ করবে।’
এ ছাড়া, দেশের বিভিন্ন শহরে অধিকাংশ ট্রাভেল এজেন্সি আইএটিএ সদস্যপদ পায়নি। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে, দেশের ছোট শহরের যাত্রীরা টিকিট সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়বে এবং তাদের খরচও বাড়বে।
মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই খসড়া পরিপত্র নিয়ে একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পর্যটন) ফাতেমা রহিম ভীনা জানান, এ বিষয়ে তিনি এখনো কোনো মন্তব্য করবেন না।
ভিন্ন দৃষ্টিকোণ
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) মহাসচিব আফসিয়া জান্নাত সালেহ জানিয়েছেন, ‘এজেন্ট টু এজেন্ট টিকিট ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করার প্রস্তাবের সঙ্গে আমরা একমত নই। পাঁচ হাজারেরও বেশি ট্রাভেল এজেন্টের মধ্যে কয়েকটি মাত্র আইএটিএ সদস্য, তাহলে বাকিরা কীভাবে ব্যবসা করবে?’ তার মতে, এটি পুরো ট্রাভেল খাতের জন্য ক্ষতিকর হবে এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সুবিধা হ্রাস পাবে।
সামগ্রিক প্রভাব
এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের ট্রাভেল এজেন্সি খাতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে। যদি নতুন পরিপত্র কার্যকর হয়, তবে সারা দেশে হাজারো ট্রাভেল এজেন্সি বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং একচেটিয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তবে, ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা যে, এই পরিবর্তন স্থানীয় প্রতিযোগিতা ও বৈচিত্র্যকে সংকুচিত করবে, সেগুলো মন্ত্রণালয়ের নজরে আনতে হবে।
এখন দেখার বিষয় হলো, মন্ত্রণালয় এই খসড়া পরিপত্রের ওপর কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং এটি কীভাবে বাংলাদেশের ট্রাভেল ব্যবসাকে প্রভাবিত করে।