বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে প্রথা অনুযায়ী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কোন বৈঠক সম্ভব নয়। গত কয়েক মাস থেকেই এমন বক্তব্য প্রচার করে আসছিল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শুক্রবার (৪ এপ্রিল) বিসমসটেক সম্মেলনের প্রাক্কালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নরেন্দ্র মোদির বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এর আগে সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের জন্য বাংলাদেশ সরকার ভারতকে আনুষ্ঠানিক ভাবে অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিয়েছিল যে, ব্যাংককে আপাতত এই ধরনের কোন বৈঠকের সম্ভাবনা দেখছেন না তারা। তাছাড়া নরেন্দ্র মোদির সফর তালিকায়ও উল্লেখ ছিল না ড. ইউনূসের সাথে বৈঠকের কোন সময়সূচী।
সাধারণভাবে বাংলাদেশে নতুন সরকার ক্ষমতাগ্রহণের পর সরকার প্রধান প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর করেন ভারতে। ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই ধারা রেখে দ্বিপাক্ষিক সফর ভারতে যেতে চেয়েছিলেন।
তবে ভারতের তরফ থেকে কোন প্রকার আগ্রহ না দেখানোয় সেটি আলোর মুখ দেখেনি। বরং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরবর্তী ৮ মাসে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক এবং কাঁদা ছোড়া ছুড়ি এক প্রকার প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম গুলো বাংলাদেশ সম্পর্কে নানা রকমের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়াচ্ছে এমন অভিযোগ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহুবার করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে যখন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবং বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে মোদি-ড. ইউনূসের বৈঠক নিয়ে বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল না ঠিক তখনই চূড়ান্ত হয়েছে এই দুই রাষ্ট্র প্রধানের বৈঠক।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে আগামীকাল বৈঠক হবে।’
কি এমন হয়ে গেল যে, হঠাৎ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে এই বৈঠকে বসতে আগ্রহী হয়ে উঠলো!
বিশ্লেষকরা বলছেন, যখন কোন দেশের সরকার চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে কিংবা চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে এমন দেখা দিলে ভারতের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির শঙ্কা তৈরি হয়। এছাড়া দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব ভারতকে শঙ্কিত করে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সফরে দেশটির রাষ্ট্রপ্রধানসহ নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি।
এসময় তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি ভৌগোলিক নানা ইস্যুতে কথা বলেন।
এসময় তিনি বলেছিলেন, ‘ভারতের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত সাতটি রাজ্য সম্পূর্ণরূপে ল্যান্ডলকড (স্থলবেষ্টিত) অঞ্চল। সমুদ্রের কাছে পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই তাদের। এই অঞ্চলের জন্য আমরাই সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক।
ড. ইউনূসের এমন মন্তব্যের পর ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় অনেক রাজনৈতিক নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ভারতের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা এমন বলেন যে, চীনে ড. ইউনূসের এমন বক্তব্য ‘৭ সিস্টারসের’ নিরাপত্তা ঝুঁকিকে প্রকাশ করে এলেন।
উল্লেখ্য, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তিস্তা মহা পরিকল্পনা। ভবিষ্যতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সহায়তা করবে চীন। আর এটি বাস্তব হলে ভারতের মানচিত্রের ‘একিলিস হিলস’ খ্যাত চিকেন নেকে বা শিলিগুড়ি করিডোরের খুব কাছেই চলে আসবে চীন। যা ভারতের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ।
তবে, শুধুমাত্র এসব কারণেই কি নরেন্দ্র মোদি ড. ইউনূসের হঠাৎ করে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন! নাকি অন্য কোন কারণও রয়েছে!
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের কেপি শর্মা অলি নেপালের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তার সাথে কোন দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেননি নরেন্দ্র মোদি। তবে এবার বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে তাঁর (কেপি শর্মা অলি) সাথেও বৈঠক করবেন নরেন্দ্র মোদি। কেপি শর্মা অলি চীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটান এবং বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে একটি নতুন আঞ্চলিক জোটের সম্ভাবনার কথা বলেন। এই জোটের সদস্যরা তাদের পণ্য উৎপাদন, বিপণন এবং পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। সেক্ষেত্রে এই অঞ্চলটি হয়ে উঠতে পারে পৃথীবির যেকোন বিনিয়োগকারীর জন্য স্বর্গরাজ্য।
নেপাল এবং ভুটানের সাথে গত কয়েকবছর থেকেই চীনের সম্পর্ক উত্তরোত্তর উন্নতি হচ্ছে। যা ভারতকে বেশ অস্বস্ত্বিতে ফেলেছে। যা দেশটির নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আপনার মতামত লিখুন :