জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের ৪ মাস পূর্তি হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাজারও ছাত্র-জনতার রক্তের মধ্য দিয়ে আমরা স্বৈরাচার, খুনি শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের পদত্যাগ নিশ্চিত করতে পেরেছি। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল তারা দায়িত্ব নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার হাসিনা সরকার কর্তৃক সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করবেন।
দুর্ভাগ্যজনক, সরকারের ৪ মাস পূর্ণ হলেও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করতে ব্যর্থ হয়েছেন। `Justice delayed is justice denied`. দায়িত্ব নিয়েই সর্বাগ্রে বিচার নিশ্চিত করার কাজ শুরু না করে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে অতিদ্রুত জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য শুরু করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। সরকার যদি বিচার নিয়ে কোন ধরনের টালবাহানা করে তবে তা প্রতিহত করবো।
রোববার (৮ ডিসেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তারা।
তারা বলেন, স্বৈরাচার হাসিনার পতনের পর আমাদের আশা ছিল, এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্রুত বাজার সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিয়ে দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়সীমার ভেতরে নিয়ে আসবে। স্বৈরাচারী সরকারের আমলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অসহনীয় মূল্য এবং অধিক মূল্যস্ফীতির চাপে জনগণ পিষ্ট হয়েছে, তাদের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীর পলায়নের পর দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়সীমার নাগালে চলে আসবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিয়ে বাজার দর নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণ এখনও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উচ্চমূল্যে নাকাল হচ্ছেন। এই অবস্থা থেকে দ্রুত পরিত্রাণ জরুরি। সরকারকে অবশ্যই সেদিকে মনোযোগী হতে হবে।
আমরা দেখেছি, আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনেরা যখন তাদের পাওনা টাকা বুঝে পাওয়ার দাবিতে আন্দোলন করেছে, তখন এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যৌথ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শ্রমিকদের সেই আন্দোলনে গুলি চালিয়েছে। সাভারে ম্যাংগো টেক্স কারখানার সুইং অপরাটের মোঃ কাওসার যৌথ বাহিনীর গুলিতে শহীদ হয়েছেন। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেলে আরেকজন গুলিবিদ্ধ শ্রমিক শহীদ হয়েছেন। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলন `দমন` করতে বর্তমান সরকার পূর্বের স্বৈরাচারী সরকারের মতই আচরণ করেছে, বলে দাবি করেন তারা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপর জাতীয় সঙ্গীত এবং জাতীয় পতাকা পরিবর্তনের দাবি করে জাতিকে বিভক্ত করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে আমরা এই ভূখন্ড, জাতীয় সঙ্গীত এবং জাতীয় পতাকা পেয়েছি। তার উপর আঘাত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাতের শামিল, বলেন তারা।
তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি করে আসছে একটি গোষ্ঠী। ছাত্রদের অধিকতর রাজনীতি সচেতন না করে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে চাওয়াকে আমরা বিরাজনীতিকরণের ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করতে চাই।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বহুল চর্চিত বিষয় হচ্ছে ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী আচরণ। ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণ এদেশের সর্বস্তরের জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা, আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য ভাগ না দেওয়া, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো, বাংলাদেশের উপর পরিবেশ বিধ্বংসী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়া, বাংলাদেশের উপর অসম চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া, বাংলাদেশের নিকট ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা নেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশকে একই সুবিধা না দেওয়াসহ ভারতের নানামুখী আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে আমরা সর্বদা লড়াই করেছি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের উপর ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণ সাম্প্রদায়িক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে ভারত এবং বাংলাদেশের উগ্র ধর্মীয় সংগঠনগুলো।
সাবেক ইসকন নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের গ্রেফতারকে ঘিরে ভারতের অযাচিত নাক গলানো এবং ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু সংঘর্ষ সংঘ কর্তৃক ত্রিপুরায় অবস্থিত বাংলাদেশ সহকারী হাই-কমিশনের হামলার মধ্য দিয়ে দুই দেশের ভেতরে জনগণের ভেতরে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানোর চেষ্টা করছে উভয়দেশের উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো। ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণকে পাশ কাটিয়ে যারা এটিকে শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক মোড়কে দেখাতে চায় তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। একইসাথে, বাংলাদেশ সহকারী হাই-কমিশনে হামলা সংঘটিত হতে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভারত কুটনৈতিক শিষ্টাচার এবং জাতিসংঘের ভিয়েনা কনভেনশনের লংঘন করেছে। ভারতকে অবশ্যই এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং হামলার ঘটনায় ক্ষমা চাইতে হবে। আমরা মনে করি, প্রতিবেশি দেশ হিসেবে ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক হতে হবে সম-মর্যাদা ও সম-অধিকারের।
তারা জানান, ভারতের যেকোন আধিপত্যবাদী আচরণ প্রতিবেশি দেশের সাথে তার সুন্দর সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। ভারতকে অবশ্যই আধিপত্যবাদী মনোভাব পরিহার করে বাংলাদেশের সাথে সম-মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ দেখাতে হবে। একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন, আমাদের লড়াই ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে, ভারতের সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে নয়। আমরা দেখেছি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশের ছাত্রদের আন্দোলনের সমর্থনে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন মিছিল করেছে। আমরা তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাই, একইসাথে ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী আচরণ পরিহার করে বাংলাদেশের সাথে সম-মর্যাদার সম্পর্ক গঠনে তারা ভারত সরকারকে চাপ প্রয়োগ করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনার পতনের পর থেকে রাষ্ট্রের বহুমুখী সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হওয়ার থেকেই বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কথা উঠে এসেছে এবং এ লক্ষ্যে কিছু কমিশন তারা গঠন করেছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঠিক কি কি সংস্কার করতে চায় এবং কত সময়ের ভেতরে করতে তা এখনও জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেনি।
বহুমুখী সংস্কারের আলাপের ভেতরে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়টি প্রায় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। অথচ, জাতি গঠনে শিক্ষার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। আমরা পূর্বে দেখেছি বারংবার শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানিয়ে নতুন নতুন শিক্ষাক্রম তাদের উপর পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সকলেই বারবার বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। দেশের ভেঙ্গে পরা শিক্ষা কাঠামো পুনর্গঠনে আমরা ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আজ এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কিছু প্রাথমিক প্রস্তাব সরকারের কাছে তুলে ধরতে চাই। পরবর্তীতে বিশদ আকারে শিক্ষা কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাবনা এবং শিক্ষানীতির প্রস্তাব আমরা সরকারের কাছে তুলে ধরবো।
আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারের প্রস্তাবনাসমূহ-
১. পর্যাপ্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ এবং বিদ্যমান প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো সংস্কার ও আধুনিকায়ন করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পর্যাপ্ত দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
২. দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণ অবৈতনিক করতে হবে। কাগজসহ সকল শিক্ষা উপকরণের দাম কমাতে হবে।
৩. পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে প্রতিযোগিতামূলক যেকোন পরীক্ষা বাতিল করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র ভালো গ্রেড অর্জনের প্রতিযোগুতা থেকে বের করে জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী করতে উদ্যোগ নিতে হবে।
৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ৩০ : ১ এ নামিয়ে আনতে হবে।
৫. বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে বিজ্ঞান শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করতে হবে।
৬. মাদ্রাসাগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী করতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় অধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে।
৭. ক্লাশরুম সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং আধুনিকায়ন করতে হবে।
৮. শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং তাদের পর্যাপ্ত ট্রেনিং নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শিক্ষককে মূল্যায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
৯. পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়া বিভিন্ন প্রগতিশীল লেখকদের লেখা পুনরায় পাঠ্যক্রমে সংযুক্ত করতে হবে।
১০. বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় গুচ্ছ পদ্ধতি ফিরিয়ে আনতে হবে।
১১. স্নাতকোত্তর নয়, স্নাতক ডিগ্রীকে চাকুরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। স্নাতকোত্তর ডিগ্রীকে অধিকতর গবেষণামুখী করে গড়ে তুলতে হবে।
১২. দেশে উচ্চমানের গবেষণার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
১৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সংশোধন করতে হবে। মানসম্মত পিএইচডি ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে।
১৪. শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর থেকে ট্যাক্স প্রত্যাহার করতে হবে এবং অভিন্ন টিউশন ও গ্রেডিং পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে।
১৫. দেশে উচ্চমানের পিএইচডি গবেষণা নিশ্চিত করতে হবে।
১৬. শিক্ষার্থীদের ভেতর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে নিয়মিতভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে হবে।
১৭. শিক্ষাখাতে জিডিপির ৮ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে।
১৮. বহুধা বিভক্ত শিক্ষা ধারা বাতিল করে একই ধারার অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রনয়ণ করতে হবে।
আপনার মতামত লিখুন :