ঢাকা শনিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৫

লাইলাতুল কদর চেনার উপায় ও সে রাতের ফজিলত

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২৫, ০৩:৪৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

‘শবে কদর’ শব্দটি ফারসি। শব মানে রাত বা রজনী আর কদর মানে সম্মান, মর্যাদা, গুণাগুণ, সম্ভাবনা, ভাগ্য ইত্যাদি। তাই আল্লাহ এই রাতকে মুসলমানদের জন্য ভাগ্য রজনী হিসেবে সম্মানিত।

শবে কদরের আরবি অর্থ হল লাইলাতুল কদর তথা সম্মানিত রাত। আর এই লাইলাতুল কদরের রাত হাজার রাতের চেয়েও উত্তম একটি রাত।

পবিত্র কোরআন নাযিলের মাধ্যমে আল্লাহ এই রাতকে হাজার রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ও মহা সম্মানিত রাত হিসেবে আমারদের জন্য দান করেছেন।

রমজান মাসের শেষ দশ রাতের মধ্যে কোনো এক বিজোড় রাত হলো ভাগ্য নির্ধারণ বা লাইলাতুল কদরের রাত।

এই রাতকে ঘিরে আল্লাহ তার বান্দাকে পাপ মুক্ত হওয়ার পথ বের করে দিয়েছেন। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত এই রাতে নিজেদের আল্লাহর দরবারে উৎসর্গ করা।

তবে লাইলাতুল কদরের রাত নিয়ে রয়েছে বিশেষ মর্যাদা, ইবাদত, ও সেসব ইবাদতের আলাদা বৈশিষ্ট্য ও ফযীলাত ।

লাইলাতুল কদরের মর্যাদা, বৈশিষ্ট্য ও ফযীলাত

(১) এ রাতে আল্লাহ তা‘আলা পুরা কুরআন কারীমকে লাউহে মাহফুয থেকে প্রথম আসমানে নাযিল করেন। তাছাড়া অন্য আরেকটি মত আছে যে, এ রাতেই কুরআন নাযিল শুরু হয়। পরবর্তী ২৩ বছরে বিভিন্ন সূরা বা সূরার অংশবিশেষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনা ও অবস্থার প্রেক্ষিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র উপর অবতীর্ণ হয়।

(২) এ রাত হাজার রাতের ইবাদতের চেয়ে উত্তম একটি রাত।

(৩) এ রাতে পৃথিবীতে অসংখ্য ফেরেশতা নেমে আসে এবং তারা তখন দুনিয়ার কল্যাণ, বরকত ও রহমাত বর্ষণ করতে থাকে।

(৪) এটা শান্তি বর্ষণের রাত। এ রাতে ইবাদত গুজার বান্দাদেরকে ফেরেশতারা জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তির বাণী শুনায়।

(৫) এ রাতের ফাযীলত বর্ণনা করে এ রাতেই একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল হয়। যার নাম সূরা কদর।

(৬) এ রাতে নফল সালাত আদায় করলে মুমিনদের অতীতের সগীরা গুনাহগুলো মাফ করে দেয়া হয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াব লাভের আশায় কদরের রাতে নফল সালাত আদায় ও রাত জেগে ইবাদত করবে আল্লাহ তার ইতোপূর্বের সব সগীরা (ছোট) গুনাহ ক্ষমা করেদেন। (বুখারী : ১৯০১; মুসলিম : ৭৬০)

কোন রাতটি লাইলাতুল কদর?

(১) সবে কদর রাতটি কেবল রমযান মাসে পালন হয়ে থাকে। আর এ রাতের ফযীলত আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত জারি রাখেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘রমাযানের শেষ দশদিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ কর।’ (বুখারী : ২০২০; মুসলিম : ১১৬৯)

(৩) অন্য হাদিসে বলা হয়েছে এ রাত রমযানের শেষ সাত দিনেও হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর (কদরের রাত) অন্বেষণ করতে চায়, সে যেন রমাযানের শেষ সাত রাতের মধ্য তা অন্বেষণ করে।’ (বুখারী : ২০১৫; মুসলিম : ১১৬৫)

(৪) রমাযানের ২৭শে রাত লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

উবাই ইবনে কাব হতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, ‘আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যতদূর জানি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যে রজনীকে কদরের রাত হিসেবে কিয়ামুল্লাইল করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হল রমাযানের ২৭ তম রাত। (মুসলিম : ৭৬২)

আব্দুল্লাহ বিন ‘উমার থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কদরের রাত অর্জন করতে ইচ্ছুক, সে যেন তা রমাযানের ২৭শে রাতে অনুসন্ধান করে। (আহমাদ : ২/১৫৭)

(৫) কদরের রাত হওয়ার ব্যাপারে সম্ভাবনার দিক থেকে পরবর্তী দ্বিতীয় সম্ভাবনা হল ২৫ তারিখ, তৃতীয় হল ২৯ তারিখে। চতুর্থ হল ২১ তারিখ। পঞ্চম হল ২৩ তারিখের রজনী।

লাইলাতুল কদর রাতে আমরা কী কী ইবাদত করব?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে এ রাত কাটাতেন এর পূর্ণ অনুসরণ করাই হবে আমাদের প্রধান অনুকরণ। এ লক্ষ্যে আমরা নিম্নবর্ণিত কাজগুলো করতে পারি....

(১) নিজে রাত জেগে ইবাদত করা এবং নিজের অধীনস্ত ও অন্যদেরকেও জাগিয়ে ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করা।

(২) লম্বা সময় নিয়ে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পড়া। এসব সালাতে কিরাআত ও রুকু-সিজদা লম্বা করা। রুকু থেকে উঠে এবং দুই সিজদায় মধ্যে আরো একটু বেশি সময় অতিবাহিত করা, এসময় কিছু দু‘আ আছে সেগুলে পড়া।

(৩) সিজদার মধ্যে তাসবীহ পাঠ শেষে দু‘আ করা। কেননা সিজদারত অবস্থায় মানুষ তার রবের সবচেয়ে নিকটে চলে যায়। ফলে তখন দু‘আ কবুল হয়।

(৪) বেশি বেশি তাওবা করবে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়া। ছগীরা কবীরা গোনাহ থেকে মাফ চাওয়া। বেশি করে শির্কী গোনাহ থেকে খালেছভাবে তাওবা করা। কারণ ইতিপূর্বে কোনো শির্ক করে থাকলে নেক আমল তো কবুল হবেই না, বরং অর্জিত অন্য ভালো আমলও বরবাদ হয়ে যাবে।

(৫) বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা। অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ কুরআন অধ্যয়নও করতে পারেন। তাসবীহ তাহলীল ও যিকর-আযকার করবেন। তবে যিকর করবেন চুপিসারে, নিরবে ও একাকী এবং কোনো প্রকার জোরে আওয়ায করা ছাড়া।

আল্লাহ কুরআনে বলেছেন ‘সকাল ও সন্ধ্যায় তোমার রবের যিকর কর মনে মনে বিনয়ের সঙ্গে ভয়ভীতি সহকারে এবং জোরে আওয়াজ না করে। এবং কখনো তোমরা আল্লাহর যিকর ও স্মরণ থেকে উদাসীন হয়োনা।’ (আরাফ : ২০৫)

(৬) একাগ্রচিত্তে দু‘আ করা। বেশি বেশি ও বারবার দু‘আ করা। আর এসব দু‘আ হবে একাকী ও বিনম্র চিত্তে কবুল হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে। দু‘আ করবেন নিজের ও আপনজনদের জন্য. জীবিত ও মৃতদের জন্য, পাপমোচন ও রহমত লাভের জন্য, দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তির জন্য।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতে নিম্নের এ দু‘আটি বেশি বেশি করার জন্য উৎসাহিত করেছেন ‘হে আল্লাহ! তুমি তো ক্ষমার আধার, আর ক্ষমা করাকে তুমি ভালোবাস। কাজেই তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। (তিরমিযী : ৩৫১৩)