আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের স্ত্রী শীলাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে কটাক্ষ করেছিলেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। সেই কটাক্ষের জবাব দিয়েছেন আসিফ নজরুল।
বৃহস্পতিবার ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এর জবাব দেন।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘শীলার সঙ্গে আমার বিয়ে হয় ২০১২ সালে। বিয়ের দুবছর পরে আমাদের কন্যা আরিনার জন্ম হয়। এর কিছুদিন পর থেকে ও হিজাব পরা শুরু করে।
আমাদের তখন একটাই প্রাইভেট গাড়ি ছিল (এখনো তাই)। সেটা প্রায় সারাদিন ব্যস্ত থাকত আমাদের আগের সংসারের তিন সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়ার কাজে। শীলা ও আমাকে প্রায়ই সিএনজি বা রিকশায় চড়তে হতো।
আমার সমস্যা হতো না তাতে। কিন্তু লম্বা ও ঘনচুল হিজাবে ঢাকা থাকার কারণে মাথা ভিজে শীলা অসুস্থ হয়ে যেত।
এটা নিয়ে আমার মন খারাপ থাকত। কিন্তু শীলা নিজ সিদ্ধান্তে অনঢ় থাকে, কোনো অবস্থাতেই হিজাব পরা ছাড়েনি কখনো।’
তিনি লেখেন, হিজাব পরা শুরুর কিছুদিন পর একটা দাওয়াতে আমরা যাই। সেখানে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও দেশের স্বনামধন্য একজন আইনজীবী আমার দিকে ভর্ৎসনার চোখে তাকালেন। আমি বুঝলাম তিনি ভাবছেন শীলা বোধহয় আমার কারণেই হিজাব পরতে বাধ্য হচ্ছে।
এরপর সমাজের নামিদামি বহু মানুষ এভাবে আমার দিকে তাকিয়েছে। আমার একটু অদ্ভুত লাগত। মানুষ কেন ভাবতে পারে না যে একটা মেয়ে সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছেয় ইসলামী জীবন বেছে নিতে পারে, হিজাবও পরতে পারে!
তিনি আরও লেখেন, শীলা একসময় অভিনয় করত। ১৯৯৫ সালে ১৪ বছর বয়সে নিজের ইচ্ছায় সে অভিনয় ছেড়ে দেয়। সে বছর অভিনয়ে জাতীয় পুরস্কার পেলে সেটা গ্রহণ করতে পর্যন্ত যায়নি ও। এর বছরপাঁচেক পর ২০০০ সালে দাদার স্কুলের জন্য ফান্ড তৈরির কথা বলে তার বাবা তাকে একটামাত্র নাটকে অভিনয়ে রাজি করাতে পারে।
এরপর কোনোদিন অভিনয়ের ধারেকাছে যায়নি সে বহু অনুরোধ পাওয়ার পরও। কিন্তু মানুষ তার অভিনেত্রী পরিচয়টা আজো মনে রেখেছে। অভিনয় না করে সে অনেক কিছু হারালো ভেবে সমবেদনায় উদ্বেল হয়েছে।
আইন উপদেষ্টা লেখেন, অথচ এ নিয়ে তার বিন্দুমাত্র দুঃখবোধ নেই। একসময় অভিনয় করত এটা মনে করতেও চায় না। সে খুশি আছে তার নিজের জীবন নিয়ে।
অর্থনীতিতে দুটো ফাস্টক্লাস ছিল তার। বড় বড় প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত সম্মানজনক পদে চাকরি করেছে, এখন কাজ করছে ‘ইকোনমিক অ্যান্ড কমার্শিয়াল স্পেশালিস্ট’ হিসেবে সবচেয়ে প্রভাবশালী দূতাবাসে।
প্রখর মেধা, প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ আর কঠোর ঔচিত্যবোধ সম্পন্ন এবং পেশাগত জীবনে অত্যন্ত সফল একজন মানুষ ও। অথচ এই সমাজের কিছু মানুষের কাছে শুধু ‘আহা অভিনেত্রী’ আর ‘আহা হিজাব’ হয়ে রয়েছে আজও। কারো কারো কাছে এজন্য দায়ী মানুষটা আর কেউ না, আমি!
আসিফ নজরুল জানান, সত্য হচ্ছে, শীলাই বরং আমাকে ধর্মের পথে নিয়ে গেছে। এখনো ফজরের আজান হলে সে আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে, ঠিকমতো যাকাত দিচ্ছি কি না সেই হিসেব নেয়, দুই বছর আগে সেই আমাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে হজ করতে নিয়ে গেছে।
আমি জীবনে কোনদিন অসৎ উপার্জন করিনি আর মানুষের উপকার করার চেষ্টা করেছি সারাজীবন। এগুলো আমার জন্মগত। কিন্তু এছাড়া জীবনে যত ভালো কিছু শিখেছি সব তার কাছে থেকে শেখা, যা কিছু ভালো করেছি সব তার অনুপ্রেরণায় করা।
তিনি জানান, আমার লাভ হয়েছে আরও অনেক। আমার মা ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক মানুষ। কখনো প্রচণ্ড বিপদে পড়লে মাকে বলতাম, আম্মা আমার জন্য দোয়া করেন। আমার ভয় কেটে যেত, মনে হতো শেষ পর্যন্ত সব বিপদ কেটে যাবে আমার। শীলার সঙ্গে বিয়ের কিছুদিন পর আম্মা মারা গেলেন। পরদিন কবরে গিয়ে অনেক কাঁদলাম। স্বার্থপরের মতো মনে হলো এখন আমার জন্য কে দোয়া করবে! কাকে বলব দোয়া করতে।
তিনি আরও জানান, আল্লাহ্ আমাকে সেই মানুষ দিয়েছেন। অপবাদ, মিথ্যাচার, হুমকি, ষড়যন্ত্র আমাকে যদি একটুও বিচলিত করে বা মর্মাহত, আমার স্ত্রী চুপচাপ কোরআন নিয়ে বসে, অনেকক্ষণ বসে থাকে জায়নামাজে। শেষ পর্যন্ত কোনো বিপদ থাকে না আমার, থাকবেও না ইনশাল্লাহ্!
আইন উপদেষ্টা সবশেষে জানান, তসলিমা নাসরিন, আপনি গতকাল আমাদের নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছেন। দোয়া করি, আপনার জীবনে হেদায়েত আসুক, কোনো একদিন আল্লাহ ক্ষমা করুন আপনাকে। আপনি সেদিন বুঝবেন এই রেষারেষির জীবনের খ্যাতি, ধনমান, ক্ষমতা এসবের চেয়ে অনেক বিশাল আল্লাহর দয়া। আমি সেটা এখনো পাইনি পুরোপুরি।
কিন্তু আমার স্ত্রী পেয়েছেন। সে কতটা ঐশ্বর্যবান, তার হৃদয়ে কতটা প্রশান্তি- এটা আপনি কোনোদিন ধারণা করতে পারবেন না। তবু আপনি ভালো থাকুন।
প্রসঙ্গত, বুধবার ফেসবুক পোস্টে তসলিমা নাসরিন শীলা এবং আসিফ নজরুলের একটি ছবি পোস্ট করে দাবি করেন, ‘মেয়েটাকে দেখলেই আমার দুঃখ লাগে।
অসম্ভব প্রতিভা ছিল অভিনেত্রী হওয়ার, কিন্তু সমস্ত প্রতিভা বিসর্জন দিয়ে এক শঠের গৃহবধূ হয়েছেন। ধর্মমুক্ত একজন প্রতিভাবান লেখকের কন্যা তিনি, অথচ চুল ঢাকেন হিজাব দিয়ে, এমনকি ফুলহাতা ব্লাউজ পরেন।
মনে হচ্ছে নিজের রুচি, সৌন্দর্যবোধ, নীতি, আদর্শ বিসর্জন দিয়ে মামলা ব্যবসায়ী ধর্মবাদীর আদেশ মেনে চলছেন। হাজিটির কিন্তু মাথায় টুপি নেই, মুখে দাড়ি নেই। হাজিটির জীবন কিন্তু যেমন ছিল তেমনই আছে। গায়ে বাড়তি কিছু চাপাতে হয়নি, প্রতিভাও বিসর্জন দিতে হয়নি।
এভাবে যে কত লক্ষ গুণী বিদুষী প্রতিভাময়ীকে এই সমাজ বুবস আর ভ্যাজাইনাতে রিডিউস করেছে!’
আপনার মতামত লিখুন :