শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫

তেলের তেলেসমাতি থামছেই না

শাহীনুর ইসলাম শানু

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৮, ২০২৪, ০৫:৫৫ এএম

তেলের তেলেসমাতি থামছেই না

ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

বোতলজাত ভোজ্যতেল সয়াবিন ঢাকার বাজারে মিলছে খুবই কম। খুচরা বাজারে প্রতি ১০টি দোকানের মধ্যে মিলছে একটিতে। যা মিলছে তাও খুচরা এবং পাম অয়েল। বিপণন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শুধু টিকে গ্রুপের পুষ্টি ‘ডিস্টিবিউটরদের’ পরিমাণে কম হলেও তেল সরবরাহ করছে।

যে কারণে চাহিদার ভিত্তিতে ঢাকায় ভোজ্যতেল সরবরাহ কম। ঢাকার বাইরের বাজারেরও একই চিত্র। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় তেল শোধন ও সরবরাহকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়ানোর দাবি জানায়। তাদের দাবির বিপরীতে ট্যারিফ কমিশন ‘না’ জানালে সরবরাহ বন্ধ করে দেয় কোম্পানিগুলো।

যার কারণে জোগানের তুলনায় সরবরাহ কমায় সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে টিকে গ্রুপ থেকে যা মিলছে তা দিয়ে চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তবে ভোজ্যতেল সরবরাহকারী দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে দাবি করলেও বাজারে তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সরকার তেল আমদানিতে ভ্যাট কমায় প্রতি লিটারে ১০ থেকে ১২ টাকা কমার কথা। সেখানে নতুন করে দাম বাড়ানোর চেষ্টাকে অন্য খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিকে উসকে দেবে বলে মনে করেন সাধারণ অনেক ক্রেতা।

বাজারে প্রতি লিটার ভোজ্যতেলের মূল্য ১৬৫ টাকা। চাহিদা বাড়তে থাকায় বোতল খুলে ১৯০ টাকায় সয়াবিন বিক্রি করছে অনেক অসাধু বিক্রেতা। যার ফলে টিসিবির লাইনে বাড়ছে অপেক্ষমাণ মানুষের সংখ্যা।

তেলের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। বৈঠকে কোম্পানিগুলোর কর্তৃপক্ষ স্থানীয় পর্যায়ে তেলের দাম বাড়ানোর দাবি জানায়। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তেলের উৎপাদন, মজুত ও আন্তর্জাতিক দর নিয়ে পর্যালোচনা করার আগে নতুন দাম নির্ধারণ করবে না বলে জানায়। সেই সূত্র ধরে আগামী সপ্তাহে তেলের নতুন দাম ঘোষণা করতে পারে ট্যারিফ কমিশন।

দাম সম্পর্কে ক্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, এখন যেসব তেল বাজারে বিক্রি হচ্ছে, তা আগের। চার-পাঁচ মাস আগে এসব তেল আমদানি করা হয়েছে। এখন বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে তারা দেশে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে।

যদিও ভোজ্যতেলের সরবরাহ বৃদ্ধি ও দাম স্বাভাবিক রাখতে অন্তর্বর্তী সরকার তৎপর। গত ১৭ অক্টোবর অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, পরিশোধিত পাম অয়েল ও সয়াবিন বীজসহ তিনটি পণ্য আমদানিতে ভ্যাট ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করে। ১৯ নভেম্বর স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে আরও ৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে শুধু আমদানিতে ৫ শতাংশ রেখেছে। সরকারের পদক্ষেপে বোতলজাত এবং খোলা তেল লিটারে ১০-১২ টাকা দাম কমার কথা। কিন্তু বাজারে উল্টো চিত্র।

এটাকে আওয়ামী সরকারের আমলে সুবিধা নেওয়া ব্যবসায়ীদের অপকৌশল বলে মনে করছেন। তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।  

ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন ঢাকার কারওয়ান বাজারের শীর্ষ ব্যবসায়ী তেল সরবরাহকারী ব্যবসায়ী মো. আবু বক্কর সিদ্দিক। কিচেন মার্কেটে গতকাল সিদ্দিক এন্টারপ্রাইজের প্রধান হিসেবে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, পুষ্টি ছাড়া কোনো কোম্পানির তেল নেই। বসুন্ধরা গ্রুপ এবং এস আলম গ্রুপের তেল সরবরাহ বন্ধ। ভারতের আদানি গ্রুপের রূপচান্দা তেল আগের মতো আসছে না। মেঘনা গ্রুপের তেলও বন্ধ। সেনাকল্যাণও এখন তেল দিচ্ছে না। তাহলে চাহিদা মিটবে কিসে?

দেশে তেল সরবরাহ সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, একমাত্র তেল পাচ্ছি পুষ্টি। কারওয়ান বাজারে প্রতিদিন ৫০০ কার্টুন তেলের চাহিদা, পাচ্ছি ১০০ কার্টুন। চাহিদা অনুযায়ী অনেক কম আসছে।

টিকে গ্রুপের সরবরাহকারী মো. সেলিম বলেন, চাহিদা থাকলেও তেল আসছে না। আজ আসছে মাত্র ১৪০ কার্টুন। এখানে দিনে তিন গাড়ি মালও এসেছে। এখনো সেই চাহিদা আছে কিন্তু দিতে পারছি না।

ট্যারিফ কমিশনের তথ্যমতে, দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২২ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় দুই লাখ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয় ২৩ লাখ টন। এনবিআরের তথ্য, গত অক্টোবর ও নভেম্বরে অপরিশোধিত সয়াবিন এবং পাম অয়েল আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৬৮ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৪ লাখ ৬০ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি ২০ শতাংশের মতো কমেছে।

তেল আমদানি সম্পর্কে এলসি সংকটে শিপমেন্ট বাতিল করতে হয়েছে বলেন বসুন্ধরা মাল্টি ফুড অ্যান্ড প্রডাক্টের বিভাগীয় প্রধান (বিক্রয় ও বিপণন) রেদোয়ানুর রহমান। তিনি বলেন, বাজারে এখনো তেল সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। তবে এলসি খোলাসহ নানা কারণে তেল আমদানি কমেছে। ফলে ২২ হাজার টন তেলের শিপমেন্ট বাতিল করতে হয়েছে বলেন তিনি।

একই সঙ্গে টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আথহার তাসলিম বলেন, কোম্পানিগুলো লোকসানের ঝুঁকিতে থাকলেও সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে সরবরাহ বেড়েছে। তবে সরকার শুল্ককর যা কমিয়েছে, তার চেয়ে বিশ্ববাজারে দর বেড়েছে বেশি বলেন তিনি।

আরবি/জেডআর

Link copied!