সারা দেশে চলমান অপারেশন ডেভিল হান্টে কার্যকর সাড়া না মেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে ঢাকা ও দেশের নাজুক এলাকাগুলোয় কম্বাইন্ড প্যাট্রোলিং শুরু করেছে যৌথ বাহিনী। দুই দিন ধরে স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী অপ্রতিরোধ্য অপরাধ থামাতে সব বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন এবং নিজে সরেজমিনে তদারক করছেন।
গতকাল ঢাকার সাভারের রাজালাখে হার্টিকালচার সেন্টারে ‘কৃষকের মিনি কোল্ড স্টোরেজ ও খামারি অ্যাপসের’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের মাধ্যমে তিনি দেশবাসীর প্রতি দেশের চলমান পরিস্থিতিতে জনগণকে নিজের হাতে আইন না তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সারা দেশে গত ১৮ দিন ধরে চলমান অপারেশন ডেভিল হান্ট ১০ হাজার ৫৭০ জন গ্রেপ্তার হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না বরং আরও নাজুক হয়ে পড়ে। বনশ্রীতে স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গুলি ও কুপিয়ে আহত করা করা হয়। এ ছাড়া ছিনতাই-ডাকাতিসহ সব ধরনের অপরাধ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশবাসীর আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
নিরাপত্তা ঘাটতিতে পুলিশ ও সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে আসছিল নাগরিকরা। জনগণ ও গণমাধ্যমের সমালোচনার মুখে নড়েচড়ে বসে সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপরই শুরু হয় পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর কম্বাইন্ড প্যাট্রোলিং। নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য মোটরসাইকেল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
ঢাকা নগরীকে অপরাধমুক্ত করতে ২৪ ঘণ্টা পুলিশের পাশাপাশি সব বাহিনীর কম্বাইন্ড প্যাট্রোলিং শুরু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানা এলাকায় ৫০০টি টহল টিম কাজ করছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থানে ৬৫টি পুলিশি চেকপোস্টসহ সিটিটিসি, এটিইউ, এপিবিএন এবং র্যাবের টহল টিম কাজ করেছে।
গতকাল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীর সদস্য সংখ্যাও বাড়ানো হবে। গতকাল ভোরে ঢাকার বেশ কয়েকটি থানা ও পুলিশ চৌকি পরিদর্শন করেন তিনি।
গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৫০০ টহল টিম সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ২৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া আগে থেকেই চলমান অপারেশন ডেভিল হান্টের ১৮তম দিনে আরও ৬৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করার তথ্য জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তর।
গতকাল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) আজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে কিশোর গ্যাং সদস্যসহ ৫১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ছিনতাইকারী সন্দেহে রাজধানীর উত্তরায় দুইজনকে ঝুলিয়ে রাখা নিয়ে করা এক প্রশ্নের উত্তরে গতকাল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি দেশের জনগণকে বলব, আইন আপনারা নিজের হাতে তুলে নেবেন না।’ আর পুলিশকে বলব, তারা আরও বেশি অ্যাক্টিভেট হওয়ার জন্য। যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। এদিকে, উত্তরায় সন্দেহভাজন দুই ছিনতাইকারীকে উদ্ধার করে গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে পুলিশ।
গতকাল ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানিয়েছেন, জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ডিএমপির টহল টিমের পাশাপাশি মহানগরীর বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ স্থানে সিটিটিসির ১৪টি, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) ১২টি এবং ডিএমপির সঙ্গে র্যাবের ১০টি টহল টিম দায়িত্ব পালন করে। এ ছাড়া ডিএমপির চেকপোস্টের পাশাপাশি পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট এপিবিএন ২০টি চেকপোস্ট পরিচালনা করে।
গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়ে ডিসি তালেবুর বলেন, মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত মোট ২৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ২৯ জন ডাকাত, ২৮ জন পেশাদার সক্রিয় ছিনতাইকারী, ছয়জন চাঁদাবাজ, ১০ জন চোর, ১৯ জন চিহ্নিত মাদক কারবারি, ৪৫ জন পরোয়ানাভুক্ত আসামিসহ অন্য অপরাধে জড়িত ব্যক্তি রয়েছে।
গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহৃত ১টি রামদা, ৪টি চাকু, ২টি সামুরাই, ১টি কাটিং প্লায়ার্স, ২টি ছুরি, ১টি শাবল, ২টি রড, সাংবাদিকতার ২টি ভুয়া আইডি কার্ড, ২টি মোটরসাইকেল, ২ কেজি ৯০০ গ্রাম তামার তার, ১৭টি চাবি, ১টি সুইচ, ৩টি দড়ি, ৫টি মোবাইল, ১২টি বিদেশি নোট, ১টি সোনার চেইন, ২টি ওভেন, ১টি ফ্রিজ, ২টি ব্লেনডার, ২টি সাব-মেশিন, ১টি জুস সিল মেশিন, ১টি সাউন্ড বক্স ও ৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৭০ টাকা উদ্ধার করা হয়।
অভিযানে উদ্ধার মাদকের মধ্যে রয়েছে ১০ হাজার ৩০২ পিস ইয়াবা, এক কেজি ১৪০ গ্রাম গাঁজা, দুই ক্যান বিয়ার ও দুই বোতল ফেনসিডিল। গত ২৪ ঘণ্টায় ডিএমপির বিভিন্ন থানায় ৬৮টি মামলা রুজু করা হয়। গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান পুলিশের এ কর্মকর্তা।
গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান অপারেশন ডেভিল হান্টে সারা দেশে আরও ৬৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ নিয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ১৮ দিনে অপারেশন ডেভিল হান্টে মোট ১০ হাজার ৫৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যান্য মামলা এবং ওয়ারেন্টের আরও ১ হাজার ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সারা দেশ থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৬৯০ জন। আসামি গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার করেছেন অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা। ২৪ ঘণ্টার অভিযানে; ১টি ৪.৫ এম এম পিস্তল, ১টি এলজি, ১টি শুটারগান, ১টি দেশীয় একনলা বন্দুক, ১টি ম্যাগাজিন, ৭টি কার্তুজ, ১টি রাইফেলের গুলি, ১টি স্টিলের দেশীয় কুড়াল, ১টি ধারালো চাপাতি, ১টি রামদা, ১টি লোহার শাবল, ১টি ক্ষুর, ২টি সুইচ গিয়ার ও ২টি লোহার রড উদ্ধার করা হয়। প্রসঙ্গত, দেশবিরোধী চক্র, সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের আইনের আওতায় আনতে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশজুড়ে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হয়। এতে পুলিশ-র্যাবের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এই অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।
আইএসপিআর জানিয়েছে, দেশের চলমান পরিস্থিতিতে জনসাধারণের জান-মালসহ সার্বিক নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড রোধ ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে দেশব্যাপী নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
এরই ধারাবাহিকতায় সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ স্বতন্ত্র এডিএ ব্রিগেড ও ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের অধীনস্থ ইউনিট, র্যাব এবং থানা পুলিশের সমন্বয়ে মোহাম্মদপুর-আদাবর, আজিমপুর, ঢাকা কলেজ, খিলক্ষেত, উত্তরা, আবদুল্লাপুর বাসস্ট্যান্ড, দক্ষিণখান, নিকুঞ্জ এলাকায় বেশ কিছু যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এসব যৌথ অভিযানে কামরাঙ্গীরচরে ডাকাতির ঘটনায় জড়িত কিশোর গ্যাং ‘কুট্টি গ্রুপ’-এর নেতা রাসেল ও তার ভাই ব্রাদার বুশসহ (সাব্বির) কিশোর গ্যাংয়ের অন্যান্য সদস্য, ছিনতাইকারী, মাদক কারবারি ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীসহ মোট ৫১ জন অপরাধীদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানের সময় তল্লাশি করে তাদের কাছ থেকে দেশীয় অবৈধ অস্ত্র ও বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। পরবর্তী সময়ে আটককৃতদের প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ এবং আইনি কার্যক্রম সম্পন্নের জন্য উদ্ধারকৃত মালামালসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। সাধারণ জনগণকে যেকোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপের বিষয়ে নিকটস্থ সেনা ক্যাম্পে তথ্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে আইএসপিআর।