ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

হট্টগোলের মধ্যে ছাত্রদের নতুন দল গঠন

এফ এ শাহেদ ও মোতাহার হোসেন
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৫, ০৯:২৮ এএম
ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

কোটা সংস্কার থেকে সরকার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়কদের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করেছে নতুন সংগঠন ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’। এদিকে আত্মপ্রকাশকে ঘিরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কমিটিতে না রাখায় দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা, হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। 

এতে ১১ জন আহত হয়েছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। যারা এই কমিটিতে আসতে পারেনি তারা অভিযোগ করে বলেন, ধস্তাধস্তির মধ্যেই ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের জন্ম হবে, সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তা ছাড়া আমরা ‘ঢাবির সিন্ডিকেট, ভেঙে দেব গুঁড়িয়ে দেব’।

গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে বিকেল ৩টার দিকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ের সোয়া দুই ঘণ্টা পর হাতাহাতি আর উত্তেজনাকর পরিবেশের মধ্য দিয়ে সংবাদ সম্মেলন হয়। এরপর কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে শিক্ষা, ঐক্য, মুক্তির স্লোগানকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করে সাবেক সমন্বয়কদের নিয়ে গঠিত এই সংগঠন।

সংগঠনের নেতৃত্বে যারা: গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে ঢাবির ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী আবু বাকের মজুমদার এবং সদস্যসচিব জাহিদ আহসান একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী। 

মুখ্য সংগঠক তাহমীদ আল মুদাসসির ঢাবির ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং মুখপাত্র আশরেফা খাতুন ঢাবির ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী নেতৃত্বে এসেছেন। অন্যদিকে, ঢাবি কমিটিতে নেতৃত্বে এসেছেন আহ্বায়ক আব্দুল কাদের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী এবং সদস্যসচিব মহির আলম ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী। 

মুখ্য সংগঠক হাসিব আল ইসলাম ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং মুখপাত্র রাফিয়া রেহনুমা হৃদি ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী।

বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ঢাবিতে উত্তেজনা: বহুল প্রত্যাশিত এ ছাত্র সংগঠনের প্রকাশ ঘটলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পদায়ন না করাকে কেন্দ্র করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে উত্তেজনা চলতে থাকে। এছাড়া এ কমিটি প্রকাশ নিয়ে কয়েকবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুই গ্রুপ ও ঢাবি শিক্ষার্থীর একাংশের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা শুরু হয়। 

গতকাল বিকেল সোয়া ৫টার দিকে মধুর ক্যান্টিনে ধস্তাধস্তির মধ্যেই কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে- এমন অভিযোগ করে মিরপুর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী নাহিয়ান জানান, এর আগেও এই কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। সাধারণ মানুষ এখন বিষয়টি কীভাবে দেখবে? তা ছাড়া সারা দেশেই আমরা এখন বৈষম্যের শিকার। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিনার হোসেন জানান, ‘বৈষম্য আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম, এখন দেখি আমি নিজেই বৈষম্যের শিকার।’ তিনি জানান, একটি পক্ষ যারা বহুল প্রত্যাশিত এ ছাত্র সংগঠনের প্রকাশ ঘটাল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পদায়ন না করে, যে কমিটি করল সেটা কি ঠিক হলো? তিনি জানান, এখন তো সারা দেশের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হবে। এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ঢাবি শিক্ষার্থীর একাংশের মধ্যে ধস্তাধস্তির বিষয়টি তো দেশবাসী ভালোভাবে নিবে না। 

নতুন কমিটি আত্মপ্রকাশের আগে থেকেই দ্বন্দ্ব: এর আগে ‎শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বাংলামোটর রূপায়ণ সেন্টারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় ১০ জন আহত হন। 

এর মধ্যে তিনজন হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে আহতদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। আহতরা হলেন- মিরপুর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাহিয়ান (১৬), ঢাকা পলিটেকনিকের শিক্ষার্থী রনি (২১) ও সাফরান (২২)।

এই বিষয়ে আহত নাহিয়ান জানান, আমরা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম, এখন দেখি আমরাই বৈষম্যের শিকার’। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এই কমিটির ঘটনায় আমাদের সঙ্গে আগে থেকেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে আসছে। 

সরেজমিনে দেখা যায়, মধুর ক্যান্টিনের সামনে সংবাদ সম্মেলনের স্থানে শিক্ষার্থীদের বলতে শোনা গেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বাদ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কমিটি মানা হবে না। কমিটিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রাখতে হবে। পাশাপাশি আরেকটি দল সাবেক সমন্বয়ক রিফাত রশিদকে কমিটিতে না রাখার প্রতিবাদ জানায়। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকাকেন্দ্রিক নতুন কমিটি হওয়ার সংবাদ সম্মেলনের পাশে স্লোগান শুরু করেন তারা। ফলে পণ্ড হয়ে যায় সংবাদ সম্মেলন।

শিক্ষার্থীদের দাবি, সাবেক সমন্বয়ক রিফাত রশিদকে কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ না দেওয়ায় তারা বিক্ষোভ করছেন। এ ছাড়া তাদের উত্তরা পূর্ব ও পশ্চিমে কমিটি না দেওয়ায় তারা বিদ্রোহ করছেন। 

এ বিষয়ে মঞ্জুরুল ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের এখনো উত্তরার পূর্ব ও পশ্চিমে কমিটি দেওয়া হয়নি। তারা এখন নতুন দল ঘোষণা করতে চাচ্ছেন। এটা অবশ্যই বৈষম্য। 

বিক্ষোভকারী আরেক শিক্ষার্থী বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রিফাত রশিদের ভূমিকা আপনারা সবাই জানেন। তাকে বাদ দিয়ে যদি কোনো কমিটি হয় তা কখনো আমাদের ম্যান্ডেট নিয়ে হতে পারে না। শিক্ষার্থী নয়ন বলেন, ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া হলো কোনো। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেন, আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান ভুলে গেলে হবে না। তাদের ছাড়া ঢাবি কমিটি আমরা কেউ মেনে নেব না।

শীর্ষ পদে আসা নিয়ে দু’গ্রুপের হাতাহাতি-সংঘর্ষ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের উদ্যোগে নতুন ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশের আগেই শীর্ষ পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। সংগঠনের আত্মপ্রকাশকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। 

এদিন বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে নতুন ছাত্র সংগঠনের একদল নেতাকর্মী ‘শিক্ষা-ঐক্য-মুক্তি’ এবং ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’ নামে স্লোগান দেন। ৪টা ৫৫ মিনিটের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে একটি দল স্লোগান দিয়ে মধুর ক্যান্টিনের সামনে অবস্থান নেয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। 

ডাকসু ভবনের সামনে ও মধুর ক্যান্টিনের ভেতরেও নতুন ছাত্র-সংগঠনের নেতৃত্বে আসা বাকের-জাহিদ ও সংগঠনের নামে স্লোগান দিতে দেখা গেছে। নতুন ছাত্র সংগঠনের উদ্যোক্তারা বলেছেন, মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক রিফাত রশিদের শীর্ষ পদে আসা নিয়ে বিভক্তির সূত্রপাত। 

রিফাত রশিদ শীর্ষ চার পদের একটিতে আসতে চাইলেও নারী সদস্যদের বিরোধিতার কারণে তাকে শীর্ষ পদ দেওয়া হয়নি। ফলে রিফাত রশিদের অনুসারী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও উত্তরার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ দেখান।

মূলধারার রাজনৈতিক পরিসরে নারীদের যে অনুপস্থিতি, সেটি মাথায় রেখে নারীর রাজনৈতিক মানস বিনির্মাণ, রাজনৈতিক চর্চার পরিবেশ তৈরি করা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নারীবান্ধব করে তোলার মাধ্যমে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগের সৃষ্টি করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের এ নতুন দল। লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির বাইরে গিয়ে ছাত্র রাজনীতিতে নতুন ধারা আনার প্রত্যয় জানানো হয় ওই সংবাদ সম্মেলনে।

হামলায় আহত যারা: হাতাহাতির ঘটনায় অন্তত ১১ জন আহতের খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। 

আহতদের মধ্যে ৯ জন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বলে নিশ্চিত করেছেন সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বয়ক মেহের। এর মধ্যে নাফসিন নামে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী রয়েছেন। 

অন্যদিকে, ঢাবির আহত দুইজন হলেন- সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মিশু আলী ও প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন বিভাগের আকিব আল হাসান।

সরে দাঁড়ালেন নাগরিক কমিটির জুনায়েদ ও রিফাত: তবে নতুন এই দলটিতে থাকছেন না জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ ও যুগ্ম সদস্য সচিব রাফে সালমান রিফাত। তিনি এক ফেসবুক পোস্টে এমনটাই জানিয়েছেন। 

এদিকে জুনায়েদের ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করে রাফে সালমান রিফাত লিখেন, ‘২৮ তারিখে ঘোষিত হতে যাওয়া নতুন রাজনৈতিক দলে আমিও থাকছি না। তবে আমার রাজনৈতিক পথচলা থেমে থাকবে না। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার যে জোয়ার তৈরি হয়েছিল তাতে শর্ট টার্মে খুব ভালো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা রাখি না আপাতত।’

‘কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখি যে, রাজনীতি একটা লম্বা রেইস। ধৈর্য নিয়ে লম্বা সময়ের জন্যই আমাদের এই রেইসে টিকে থাকতে হবে। আমরা নতুন সেই বাংলাদেশের প্রত্যাশি যেটা হবে সত্যিকার অর্থেই ডেমোক্রেটিক, ইনক্লুসিভ, বৈষম্যহীন এবং আধিপত্য মুক্ত’, লিখেছেন রাফে।

তিনি আরও লিখেছেন, ‘ঐক্যবদ্ধতা ও মধ্যমপন্থাই হবে আমাদের শক্তি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের জিহাদ চলবে। আঞ্চলিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও আমাদের লড়াই চলবে। বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আমরা জান দিয়ে লড়ব। নতুন দলের জন্য দোয়া এবং শুভকামনা রইল।’