জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের একাংশ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ের ফটক অবরুদ্ধের ২৮ ঘণ্টা পর তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার আন্দোলনরত আহতদের ওই গ্রুপ জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) নিয়ে আসলে সেখানে থাকা আহত অন্য একটি গ্রুপের সঙ্গে কথা কাটাকাটির জেরে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আহতরা বলেন, কথা রাখেনি সমন্বয়করা, তারা দল গঠনে ব্যস্ত। একই সাথে, উপদেষ্টারা শুধুই আশ্বাস দিয়েছেন গত ৭ মাস ধরে, কিন্তু কিছুই পূরণ করেননি।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে বসে পড়া জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে নিটোর হাসপাতালে আনা হলে সেখানে থাকা আহত অন্য একটি গ্রুপ তাদের শান্ত করতে এগিয়ে গেলে তর্ক-বিতর্ক থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের শান্ত করে।
প্রধান উপদেষ্টার ফটকে অবস্থান কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়া জামিলা আক্তার লতা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সি’ নামের কোনো ক্যাটাগরি থাকবে না। আমরা যারা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলাম তাদের জোর করে তুলে আনা হয়েছে নিটোরে। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, দুটি মাত্র ক্যাটাগরি করতে হবে।
একটি হবে সক্ষম এবং অপরটি অক্ষম। সবাইকে ভাতার আওতায় আনতে হবে। আমরা যতবার যত জায়গাতে গিয়েছি আমাদের অপমান করা হয়েছে। শহিদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য একটি আইন করা এবং জুলাই আন্দোলনে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যারা আহত হয়েছেন, তাদের সেবা নিশ্চিত করতে হটলাইন নম্বর চালু করতে হবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমাদের প্রতি কারো কোনো ‘নজর নেই’। আমরা আহত হয়ে জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করলাম আর মজা নিচ্ছে সমন্বয়করা। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের এখন নেই। সমন্বয়করা যে কথা দিয়েছিল তা তারা রাখেননি। তারা এখন রাজনৈতিক দল গঠনে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, আহতদের আজীবন সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং একেবারে প্রত্যন্ত এলাকাতেও একজন আহত যেন স্বাস্থ্যসেবা পান সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সারা দেশে প্রায় দেড় হাজার আহত আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। অনেকেই ঢাকার পথে আছেন, আবার অনেকে এ মুহূর্তে লম্বা যাত্রা করার মতো অবস্থায় নেই বলে আসতে পারছেন না।
আহত মো. মাসুদ বলেন, সরকারের লোকজন ‘বাটপার’। উপদেষ্টারা আমাদের দেখতে আসেননি। যেসব উপদেষ্টা এক-দুইবার এসেছিলেন তারা শুধুই আশ্বাস দিয়েছেন কিন্তু সে আশ্বাস ভুলে গেছেন তারা, এখনো পূরণ হয়নি। আমাদের দিকে সরকারের ‘নজর নেই’।
আন্দোলনের সময় মহাখালীতে আমার ডান হাতে গুলি লেগে বেরিয়ে যায়। সরকার আহতদের যে তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে, তা আমরা মানি না। দুটো ক্যাটাগরি হতে হবে, যারা আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, অর্থাৎ পঙ্গু হয়েছেন, তাদের ‘এ’ ক্যাটাগরিতে এবং যারা আহত হওয়ার পরেও কর্মক্ষম, তাদের ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রাখতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার তাদের ‘মোটেও পাত্তা দিচ্ছে না’। এর আগে পঙ্গু হাসপাতালের সামনে যে আহতরা আন্দোলন করেছিলেন, তাদের কোনোভাবে ‘ম্যানেজ’ করে ফেলেছে সরকার- দাবি করেন তিনি।
আন্দোলনকারীদের মধ্যে আহতদের আরেকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন জানান, রামপুরা এলাকায় ১৯ জুলাই তার ডান পায়ে, গায়ে ও চোখে ছররা গুলি লাগে। ডান পায়ে এখনো ৭০ থেকে ৮০টির মতো স্পিøন্টার রয়ে গেছে। ডান চোখে এখনো ভালো করে দেখেন না। বৈষম্য নিরসনের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে আমরা আহত হলাম, অথচ এখন আমরাই বৈষম্যের শিকার হচ্ছি।
অনেকে অভিযোগ তোলেন, পঙ্গু হাসপাতালের সামনে আন্দোলন করা আহত নেতারা সব বাটপার। ওরা ওদের পাওনা সরকারের কাছ থেকে ভালোভাবেই বুঝে নিয়েছে। তাদের দেখে সুস্থ মনে হলেও সব ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। তারা আহতদের ওই অংশকে ‘দালাল’ বলেও আখ্যায়িত করেন।
এ সময় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এবং নিটোরে চিকিৎসারত আহতদের একটি অংশ তাদের এসব বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট আহতের সমন্বয়ক আহত মো. রুবেল রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা এখানে এসেছিলাম যারা রাস্তাতে অবস্থান নিয়েছিলেন তাদের জানাতে, সরকার আমাদের প্রতি আন্তরিক রয়েছে। প্রতিটি মহল আমাদের জন্য সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। যারা এখন দু’দিন পরপর রাস্তায় বসে পড়ছেন তাদের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
যাদের আজ রাস্তা থেকে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছে, আমরা চাই তারা তাদের যোগ্য সম্মান ও চিকিৎসা পাক। তবে তাদের ভেতর অনেকে আছেন যারা সচিব থেকে শুরু করে সরকারের অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন, যা আমাদের কারোরই কাম্য নয়।
তাদের এমন আচরণের জন্য আমরা বারবার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। তারা অনেকে অভিযোগ করে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে অনেক কম আহতদের দেওয়া হয়েছে, এগুলো মিথ্যা। আমিসহ যারা চক্ষু হাসপাতাল থেকে এখানে এসেছি, আমরা মূলত নিয়মিত সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলছি।
তাদেরকে বলছি, এসব কর্মসূচি বন্ধ করে যেন ধৈর্য ধারণ করে যা সবার জন্য মঙ্গল। কারণ, সরকারের পক্ষ থেকে সব ক্যাটাগরি পুনঃবিবেচনা করা হচ্ছে। যেহেতু কোনো কারণ ছাড়া তারা রাস্তা অবরোধসহ অযৌক্তিকভাবে নানা কর্মসূচি দিচ্ছে, আমরা বলতে চাই, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। নির্দিষ্ট স্বার্থে তারা এমন বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছে বলেও দাবি করেন।
তেজগাঁও থানার ওসি মো. মোবারক হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আহত যারা চিকিৎসা নিশ্চিতের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ফটক ২৮ ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন তাদের নিটোর হাসপাতালে আনা হয়েছে। সবার সুচিকিৎসা পাবার অধিকার রয়েছে, তারা তাদের চিকিৎসা পাবেন।
উল্লেখ্য, আহতের আরেকটি অংশ গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ দেখান। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান-নিটোর এবং সাভারের সিআরপিসহ বিভিন্ন সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া আহত ব্যক্তিরাও ছিলেন তাদের মধ্যে।
পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহর কাছ থেকে কিছু দাবি পূরণের আশ্বাস পেয়ে সেদিন রাতে তারা হাসপাতালে ফিরে যান।
জুলাই আন্দোলনে আহতদের জন্য সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা করা, তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া ও রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করা; যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা; নারী যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় বিশেষ ঘোষণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা; বিনামূল্যে বিমান, রেল ও বাসে চলাচলের ব্যবস্থা করা, যানবাহন কেনায় শুল্ক-কর মওকুফ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক রাষ্ট্রীয় অতিথিশালাগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কথাও রয়েছে তাদের দাবির মধ্যে।
আপনার মতামত লিখুন :