ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫

দেশি-বিদেশি প্রপাগান্ডা রুখতে মোক্ষম জবাব জাতীয় নির্বাচন

এফ এ শাহেদ
প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২৫, ১২:২৯ এএম
ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ, এমনকি লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাসহ কিছু ঘটনা সুযোগসন্ধানীরা ঘটিয়েছে। এসব সহিংসতা ঘিরে বিদেশের কিছু গণমাধ্যম প্রচার করছে উসকানিমূলক প্রতিবেদন। 

ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), টিকটক ও ইউটিউবের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে প্রপাগান্ডা ও গুজব। সাম্প্রদায়িকতা ছড়াতে নানা রং দেওয়া হচ্ছে। এমন অবস্থায় সঠিক সমাধান হবে দ্রুত জাতীয় নির্বাচন। চলমান এসব বিষয়ে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ কথা বলেছেন রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক এফ এ শাহেদ

রূপালী বাংলাদেশ: গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম ঈদে ফ্যাসিবাদ পুনরুত্থান রোধে এবং নির্বাচনমুখী হতে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

ববি হাজ্জাজ: ’২৪-এর জুলাই-আগস্টে ৩৬ দিনের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অবসান ঘটে প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ শাসনের। প্রায় ২ হাজার মানুষের আত্মত্যাগে স্বৈরাচারমুক্ত হয় দেশ। আওয়ামী লীগের শাসনামলে উদযাপিত হয়েছে ৩৪টি ঈদ। 

সেই সব ঈদ কেবলই দুঃখগাথা ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের স্মৃতিতে। ভয়ংকর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যুগপৎ আন্দোলনে সব রাজনৈতিক দল তাদের মূল বিষয়গুলোতে একমত রয়েছে। 

দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণাসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা দাবিতে প্রয়োজনে কর্মসূচি পালন করা হবে। তবে ফ্যাসিবাদ পুনরুত্থান রোধ এবং নির্বাচনমুখী কর্মসূচি কেমন হবে তা আলাদাভাবে বলার কিছু নেই। 

আমরা সবাই নির্বাচনের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। দেশে এই উৎসবের মধ্যেও এবার চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহিদ যোদ্ধাদের গর্বিত এবং একই সঙ্গে বেদনাবিধুর স্মৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঈদে তাদের পরিবার এবং আহত যোদ্ধা, যারা এখনো হাসপাতালে, তাদের জন্য এই উৎসব অন্যরকম।

রূপালী বাংলাদেশ: দেশে ও দেশের বাইরে প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, জনগণ অনেক সময় বিভ্রান্ত হচ্ছে; এর সুদূরপ্রসারী কোনো প্রভাব পড়বে কি না; এসব  রুখতে করণীয় কী?

ববি হাজ্জাজ: আমরা মানুষের জন্য কাজ করছি, বিগত ১৫ বছর স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। আগামীতেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমাদের যুদ্ধ করতে হবে। আর কখনো যেন এ দেশের মাটিতে স্বৈরাচার জন্ম না নেয়, সেভাবেই আমাদের কাজ করে যেতে হবে। 

স্বৈরাচার বন্ধ করার একমাত্র পথ জনগণের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া। আর জনগণের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার একমাত্র পথ নির্বাচন। নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠালাভ সম্ভব। দেশে ও দেশের বাইরে যে প্রপাগান্ডা ছাড়ানো হচ্ছে, তা রুখতে সর্বোত্তম উপায় দ্রুত সময়ের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। 

প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এমনকি লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক, আবার কিছু ঘটনা সুযোগসন্ধানী অপশক্তি ঘটিয়েছে। 

এসব সহিংসতা ঘিরে বিদেশের কিছু গণমাধ্যম প্রচার করছে উসকানিমূলক প্রতিবেদন। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), টিকটক ও ইউটিউবের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে ভয়াবহ প্রপাগান্ডা ও গুজব। 

সাম্প্রদায়িক রং মাখিয়ে বানানো এসব গুজব-প্রপাগান্ডার ঢেউ এসে পড়ছে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মেও। এসব প্রপাগান্ডা রুখতে জাতীয় নির্বাচন মোক্ষম জবাব। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ৯০ শতাংশ গুজব-প্রপাগান্ডা কমে যাবে। 

রূপালী বাংলাদেশ: দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য নির্বাচন জরুরি কি? 

ববি হাজ্জাজ: আমরা দেশের সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতি করছি, মানুষের সেবা করতে রাজনীতি করছি। স্বাধীনতার ৫৩ বছরে যত সরকার এসেছে, এ দেশকে তারা শোষণ করেছে। প্রতিটি সরকার বিদেশে অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয়করণ ছাড়া আর কিছুই করেনি। 

এনডিএম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী, উন্নয়নে বিশ্বাসী। নির্বাচন ও রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগকে দূরে রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণ এই ফ্যাসিবাদী শক্তিকে আর দেখতে চায় না। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ প্রশ্নে যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থাকবে এনডিএম। 

এখানে কোনো ‘ইফস অ্যান্ড বাটস’ নেই। সরকারের ভেতরে বা বাইরে যারাই আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চাইবে, তাদেরই জনগণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হিসাব দিতে হবে। দেশের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে, আরও উন্নয়ন যদি আমরা দেখতে চাই তাহলেও আমাদের নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব দিতে হবে। 

আমাদের বিশ্বাস, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে দ্রুতই জাতীয় নির্বাচন দেখব। যদিও এখনো অন্তর্বর্তী সরকার পরিষ্কার করেনি তারা কবে নির্বাচনটা দেবে, এই জায়গাটা পরিষ্কার করলে সবার জন্য ভালো হয়।  

রূপালী বাংলাদেশ: দেশের উন্নয়নের জন্য কোনটা বেশি জরুরি বলে আপনারা মনে করছেন? 

ববি হাজ্জাজ: ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে পতিত স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিদায়ের পর এ দেশে এক নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে। ২০১৭ সালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দল হিসেবে এনডিএম আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার থেকেছে। 

বিএনপির নেতৃত্বে হাসিনার পতনের এক দফা দাবি আদায়ে যুগপৎ আন্দোলন করেছে এনডিএম। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও আমরা রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছি। তার পরিপেক্ষিতেই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। 

বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কার কমিশন গঠন করে সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে; তার বেশির ভাগ প্রস্তাবের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) একমত। তবে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রশ্ন এলেই এখানে নির্বাচনের বিষয়টি চলে আসে। 

নির্বাচন ছাড়া আইনি অধিকার থাকে না সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করার। সুতরাং সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের জন্য হলেও নির্বাচন প্রয়োজন। 

রূপালী বাংলাদেশ: আওয়ামী লীগ নিয়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে এনডিএম কী ভাবছে?

ববি হাজ্জাজ: হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুনভাবে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার চেয়ে অভিযোগ দায়ের করে এনডিএম। 

একই সঙ্গে আমরা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বিচারও চেয়েছি। দুঃখজনক হলেও সত্য, নতুন খসড়া আইনে এই ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সংগঠনের বিচার করার এখতিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে আমাদের লড়াই থেমে যায় নাই। 

আমাদের কথা পরিষ্কার, বাংলাদেশের পবিত্র জমিনে অগণিত ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক কর্মী, আলেম-ওলামা, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের রক্ত ঝরানো আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে পারবে না। আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার যেকোনো ‘প্রকল্প’ আমরা রক্তের বিনিময়ে রুখে দিব ইনশাআল্লাহ।

রূপালী বাংলাদেশ: যুগপৎ আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে কোনো দ্বিমত আছে কি?

ববি হাজ্জাজ: যুগপৎ আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে কোনো ফাটল বা সম্পর্কের ঘাটতি নেই। জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে শরিক দলগুলো একমত। 

কিছুদিন একটি দল জাতীয় নির্বাচনের সময়ের বিষয়ে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করলেও এখন তারাসহ সবাই একমত। আর যে একটি বিশেষ দল জাতীয় নির্বাচনের ইস্যুতে দেরি করতে চাইছে, তারা যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী ছিল না। 

রূপালী বাংলাদেশ: সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

ববি হাজ্জাজ: আপনাকে এবং দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকেও ধন্যবাদ।