ঢাকা শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫

করের আওতায় আসছে রাজনৈতিক দলগুলো

শাহীনুর ইসলাম শানু
প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২৫, ০৫:৪৫ এএম
ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

আয়করের আওতায় আসছে দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো। দলগুলোর আয় করযোগ্য হলেও আওতামুক্ত করে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার। 

করের আওতামুক্ত হওয়ায় দলগুলোর আয়ের উৎস নিয়ে অন্ধকারে রয়েছে সরকারে রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

আয়করের আওতাভুক্ত হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে কারা অর্থায়ন করছে, অর্থের উৎস কী- এমন অনেক তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে। 

তাই নতুন আয়কর আইনে নিবন্ধিত দলগুলোকে করের আওতায় আনার প্রস্তাব করেছে আয়কর আইন সংশোধনে গঠিত টাস্কফোর্স কমিটি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরে ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে সরকারের নির্দেশে দেশের নিবন্ধিত দলগুলোকে শর্তহীনভাবে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। 

নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সব আয়কে শর্তহীনভাবে আয়কর থেকে অব্যাহতি দিয়ে একটি এসআরও জারি করে এনবিআর। সেই এসআরও রহিত করার পক্ষে মত দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত টাস্কফোর্স। 

একই সঙ্গে টাস্কফোর্সের মতামতকে গ্রহণযোগ্য বলে মত প্রকাশ করেন দেশের অর্থনীতিবিদরাও। এতে করে দলগুলোর জবাবদিহিতার পথ উন্মুক্ত হবে। 

অন্যদিকে বৈষম্য কমাতে সরকারে থাকা শীর্ষ পদগুলোর কর অব্যাহতির সুবিধা কমাতেও সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স। 

বাংলাদেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এখন ৫৪টি। তার মধে ১০টি নিবন্ধন পেয়েছে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে। 

তবে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের আগস্টে জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক ও নিবন্ধন বাতিল করে আদালত। ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন কশিমন এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপনও জারি করে।

তবে রাজনৈতিক দলগুলোতে যারা ফান্ডিং করে থাকে তাদের বিষয়টি কখনো জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয় না। ফলে এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। 

অনেকের ধারণা, রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া ফান্ডের একটি বড় অংশই জোগান দেয় কালো টাকার মালিকরা। 

জানতে চাইলে টাস্কফোর্সের এক সদস্য বলেন, ‘আয়কর অব্যাহতি দেওয়ার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর আয়কর রিটার্ন জমা দিলেও সেগুলো যাচাই করার কোনো সুযোগ নেই। 

যেহেতু তাদের কোনো ধরনের আয়কর দিতে হয় না, সেজন্য আয়কর রিটার্নের তথ্যগুলো সঠিক কি না, সেটা যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা থাকে না। কিন্ত আয়কর অব্যাহতি না থাকলে সেটা এনবিআরের যাচাই-বাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে।

ফলে ‘রাজনৈতিক দলগুলোতে কারা অর্থায়ন করছে, অর্থের উৎস কি- এসব তথ্য যাচাই করা হয় না। তবে নতুন আইনে এখন করা যাবে। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তৈরি হবে। 

বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনে যে আয়-ব্যয়ের তথ্য জমা দেয়, এনবিআরের কাছে একই তথ্য দিয়ে তারা রিটার্নও দাখিল করে। কিন্তু সেসব তথ্যের যথার্থতা যাচাই করে দেখা হয় না’ বলেন তিনি। 

গঠিত টাস্কফোর্স কমিটি: গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর আয়কর আইন, ২০২৩ সংস্কার নিয়ে সাত সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। 

কর অঞ্চল-৬ এর কর কমিশনার ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুনকে টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক এবং কর অঞ্চল-১৪ এর পরিদর্শী রেঞ্জের যুগ্ম কর কমিশনার অমিত কুমার দাসকে সদস্য সচিব করা হয়। 

অন্য সদস্যরা হলেন- এনবিআরের প্রথম সচিব (করবিধি) এম এম জিল্লুর রহমান, কর অঞ্চল-১৯ এর কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) ড. লুৎফুর নাহার বেগম, বিসিএস কর একাডেমির পরিচালক হাফিজ আল আসাদ, কর আপিল অঞ্চল-২ এর যুগ্ম কর কমিশনার তাপস কুমার চন্দ এবং কর অঞ্চল-১৪ এর পরিদর্শী রেঞ্জের যুগ্ম কর কমিশনার মহিদুল ইসলাম চৌধুরী।

টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে তাদের প্রস্তাব সুপারিশ আকারে এনবিআরের চেয়ারম্যানের কাছে জমা দিয়েছে।

টাস্কফোর্স কমিটি সুপারিশ: আয়কর অব্যাহতির সুযোগে আরও সুবিদা পাচ্ছে দলগুলো। বিশেষত নাগরিকের কাছে জবাবদিহিতা নেই। জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহির রুদ্ধপথ উন্মুক্ত হবে। 

একই সঙ্গে বৈষম্য কমাতে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের আয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর অব্যাহতির সুবিধা কমানোর সুপারিশ করেছে আয়কর সংস্কারে গঠিত টাস্কফোর্স কমিটি।

টাস্কফোর্স রাজনৈতিক দলগুলোর আয়কর সুবিধা বাতিলের পক্ষে চারটি যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে। প্রথম দুটি কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, আয়কর সুবিধার কারণে জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলের জবাবদিহির পথ রুদ্ধ হয়েছে এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির করদাতাদের কর সুবিধা দেওয়ার জন্য এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। 

তবে বাকি যে দুটি কারণে আয়কর সুবিধা বাতিল করা দরকার বলে মনে করছে টাস্কফোর্স সেগুলো হচ্ছে- অর্থ পাচার ও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ তৈরি হওয়া ও দুর্নীতির পথ আরও উন্মুক্ত করার অভিযোগ।

নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতি বছরের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আগের পঞ্জিকা বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব ইসিতে জমা দিতে হয়। 

এ ছাড়া নির্বাচনের জন্য প্রার্থী মনোনয়নকারী প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে সব নির্বাচনি এলাকার নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে প্রার্থীদের নির্বাচন নিয়ে ব্যয় বা অনুমোদিত ব্যয়ের হিসাব কমিশনে দাখিল করতে হয়।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে কে অনুদান দিচ্ছে, কত অনুদান দিচ্ছে তার কোনো স্বচ্ছতা নেই। 

রাজনৈতিক দলগুলো সুশাসন, জবাবদিহির কথা বলে। সে কারণে দলগুলোর আয়-ব্যয়ের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটা প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। 

রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু সরকার গঠন করে সেজন্য তাদের মধ্যে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

বাংলাদেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এখন ৫৪টি। তার মধ্যে ২০১৩ সালের আগস্টে জামায়াতের প্রতীক এবং নিবন্ধন বাতিল করে আদালত। 

ফলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও জামায়াতের কোনো নিবন্ধন নেই। নিবন্ধন ও প্রতীক বাতিলের বিরুদ্ধে জামায়াত আপিল করেছে। 

কিছুদিন পর আপিল বিভাগে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে আগামী ২০ এপ্রিল নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের শেষ সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এবার নতুন দল হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নিবন্ধনের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।