নৌকার সাইনবোর্ড লাগিয়ে বরিশালে গত কয়েক বছরে ধান্ধা করে কোটিপতি বনে যাওয়া এবং ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরে কর্মীদের ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ওপর বেজায় চটেছেন তৃণমূল কর্মীরা।
জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ওপর হামলাসহ একাধিক মামলায় জড়িয়ে অসংখ্য নেতাকর্মী কারাগারে রয়েছেন। পাশাপাশি গ্রেপ্তার এড়াতে অনেকেই রাতে বাসায় ঘুমাতেও পারছেন না। এমন বাস্তবতায় ঈদুল ফিতর পালিত হলেও হামলা-মামলা এবং হয়রানির শিকার তৃণমূল নেতাকর্মীদের অর্থনৈতিক দৈন্যতা নিয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।
এই চরম দুর্দিনেও হয়রানির শিকার কর্মীদের খোঁজ-খবর না রাখা, এমনকি যোগাযোগ রক্ষা না করাসহ বরিশালের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের আচারণে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও ত্যক্ত-বিরক্ত।
কর্মী-সমর্থকরা অভিযোগ করেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট বরিশালের শীর্ষসারির আওয়ামী লীগ নেতাদের অন্যত্র সরে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তাদের পরবর্তী কার্যক্রম অপ্রত্যাশিত এবং দলের জন্য ক্ষতিকরও বটে।
৫ আগস্টের পরে অসংখ্য নেতাকর্মী হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আবার কেউ গ্রেপ্তার আতঙ্কে আয়-ইনকাম বন্ধ করে পরিবার-পরিজন রেখে পালিয়ে আছেন।
তৃণমূল কর্মীদের হামলা-মামলা বা গ্রেপ্তার আতঙ্কে দিন কাটাতে হলেও শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগও করা যাচ্ছে না। এমনকি ঈদ উৎসব কেমন কাটছে সেই খোঁজ-খবরও কেউ নেননি নেতারা।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর সহযোদ্ধা হিসেবে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছেন ২৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সোহেল মোল্লা। তিনি শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রভাবশালী মোল্লা পরিবারের সন্তান।
বিগত সময়ে দলীয় পদ-পদবি বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মী দ্বারা বহুবার হামলা-মামলায় নির্যাতিত। এই নেতার বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলার কোনো অভিযোগ না থাকলেও বিএনপির দুটি মামলায় অভিযুক্ত তিনি।
ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে মাস দেড়েক কারাবন্দি থেকে জামিনে বেরও হয়েছেন সোহেল মোল্লা। কিন্তু তার পরিবারে এবার ঈদ উৎসব তো নেই-ই, সঙ্গে মানসিক শান্তিও নেই বলেও জানিয়েছেন।
ক্ষুব্ধকণ্ঠে এ প্রতিবেদকের কাছে মোল্লা অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, হারিয়েছেন চাকরি। গ্রেপ্তার হয়ে ত্রিশ দিনের বেশি জেলখানায় ছিলেন, তখন ২-৪ দলীয় বড় ভাই পরিবারের খোঁজ-খবর নিয়েছিল।
কারাগার থেকে বের হওয়ার পরে আর কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এমনকি তার নেতা সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহসহ স্থানীয় নেতৃত্বসারির নেতাদের সঙ্গে ঈদের দিনেও শত চেষ্টা করে মুঠোফোন বা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে পারেননি।
নেতাদের এমন আচরণে ত্যক্ত-বিরক্ত জানিয়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগের একাধিক কর্মী অভিযোগ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল গোটা নগরীর শাসন করেছেন।
তার নেতৃত্বে অসংখ্য ছেলে পোর্টরোডে কাজ করেছেন। ৫ আগস্টের পরে তাদের নেতা বরিশাল ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে অবস্থান নিয়েছেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানে তিনি কোটি কোটি টাকা পাচার করেন।
কলকাতার দমদমে তার শ্বশুরবাড়িতে বরিশাল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগসহ অঙ্গসংগঠনের বেশ কিছু নেতাকর্মীও তার সঙ্গে বিলাসী জীবনযাপন করছেন, যা দেখেশুনে তৃণমূল নেতাকর্মীরা রীতিমতো ক্ষোভে ফুঁসছেন।
কর্মীদের অভিযোগ, শুধু ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা নেতাদের বিরুদ্ধে নয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ক্রোড়পতি বনে গেছেন, কিন্তু ৫ আগস্টের পরে ভোল পাল্টে ফেলেছেন নেতাদের এমন আচারণও কর্মীদের সংক্ষুব্ধ করেছে।
উদাহরণস্বরূপ দেখানো হচ্ছে, বরিশাল সদর আসনের সাবেক এমপি জেবুন্নেছা আফরোজকে। ২০১৪ সালে তার স্বামী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ সদস্য শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যু হয়।
সেই সহানুভূতি পুঁজি করে তিনি নৌকার টিকিট বাগিয়ে নিয়ে একতরফা ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। তখন হিরনের কর্মী-সমর্থকেরা তার প্রতি নজিরবিহীন সমর্থন রেখেছিল। পরবর্তী সময়ে অরাজনৈতিকসুলভ আচরণ এবং কর্মীদের আগলে রাখতে ব্যর্থ হলেও বিভিন্ন পন্থায় কোটি কোটি টাকার হাতিয়েছেন।
বরিশাল নগরীতে হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ একাধিক বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অংশীদার তিনি। বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি জেবুন্নেছার বিরুদ্ধে কর্মীদের অভিযোগ, তিনি সরকার পতনের পরে তেমন একটা প্রকাশ্যে আসছেন না। এবং কর্মী-সমর্থকদেরও খোঁজ-খবর রাখছেন না।
অনেকে অভিযোগ করেছেন, ঈদের আগে-পরে ফোন করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি তিনি আলেকান্দার বাড়ি ছেড়ে কোথায় আশ্রয় নিয়েছেন তা-ও অনেকের জানা নেই।
১০নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, সাবেক কাউন্সিলর ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে তিনি রাজনীতি করতেন।
কিন্তু ৫ আগস্টের পরে জয়নাল ভোল পাল্টে নিজেকে বিএনপি দাবি করলেও কয়েকটি মামলায় তাকে অভিযুক্ত হতে হয়। এবং বেশ কিছুদিন কারাগারে থাকলেও সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা হয়েছে।
সাবেক সিটি মেয়র আবুল খায়ের ওরফে খোকন সেরনিয়াবাতের অনুসারী জয়নাল আবেদীন ২০০৩ সালে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে দলীয় ঘরানার বিরোধী অংশটি- অর্থাৎ সাদিকপন্থিদের ওপর স্ট্রিমরোলার চালিয়েছেন, বাদ যায়নি বিএনপিও।
তার বিরোধিতা করায় স্থানীয় বাসিন্দা ইউনুসের ভাতের হোটেল উচ্ছেদ করাসহ অসংখ্য নেতাকর্মীর আয়ের পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন, যা এখনো তার ছেলে-স্বজনেরা যথারীতি ধরে রেখেছেন। তবে এখন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীকে ভাগ দিয়ে খেতে হচ্ছে বলে কেডিসির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করে।
কর্মীদের অভিযোগ, জয়নাল স্থানীয় বিএনপি নেতা কামরুল এবং তোতার সঙ্গে সখ্য গড়ে এলাকায় আছেন, নিয়মিত চাঁদাবাজিও চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি মামলা-হয়রানিতে অসহায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের অসহায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করছেন না। এমনকি পবিত্র ঈদ উৎসবে তিনি ওয়ার্ডের নিপীড়িত-নির্যাতিতদের কোনো খোঁজ-খবর নেননি।
বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ অনুরূপ। কর্মীদের অভিযোগ, তাদের শীর্ষনেতা বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাই আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ জুলাই মাসে ছাত্র আন্দোলনের আগেই দেশ ছেড়েছেন।
আন্দোলন চলাকালীন তিনি কয়েক দফা দেশে ফেরার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আর আসেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক পদধারী নেতা অভিযোগ করেন, হাসনাত আব্দুল্লাহ আওয়ামী লীগের শাসনামলের শেষের ১০ বছর বরিশালে একক আধিপত্য বিস্তার করেছেন। এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন মাধ্যম হাজার কোটি টাকাসহ অঢেল জমি-জমার মালিক হয়েছেন।
পাশাপাশি তার পছন্দসই কজন নেতাকেও অবৈধপন্থায় ক্রোড়পতি বানিয়েছেন। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে তাদের অধিকাংশই গ্রেপ্তার-ঝুঁকি এড়াতে আত্মগোপনে থাকার অজুহাতে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে আছেন এবং করছেন দুর্নীতির অর্থে বিলাসী জীবন-যাপন।
মুসলিম ধর্মের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল ফেতরে এই হাসনাত আব্দুল্লাহ, তার কমিটির সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস, সাদিক আব্দুল্লাহ এবং জেবুন্নেছা আফরোজসহ অনেক দায়িত্বশীল নেতা কর্মী-সমর্থকদের খোঁজ রাখেননি, যার কারণে ক্ষোভে ফুঁসছেন তৃণমূল।
দলের দায়িত্বশীল মহলের এমন বিরূপ আচরণের কারণে এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণাও দিচ্ছেন নির্দ্বিধায়। বিশেষ করে ছাত্রলীগের একটি বড় অংশ নেতাদের রূঢ় ব্যবহারে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন, যাদের অনেকে এখন একাধিক মামলার আসামি হয়ে সতর্কতার সঙ্গে পথ চলছেন।
বরিশাল জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, তাদের সংগঠনের শীর্ষ নেতারা ৫ আগস্ট পালিয়ে যাওয়ার পরে প্রথম কিছুদিন কোনো যোগাযোগ করা যায়নি। মোবাইল ফোন বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকও ডিজেবল করে রাখেন।
দেশের পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে কর্মীদের সঙ্গে তারা ফের যোগাযোগ শুরু করেন। কিন্তু ঈদের আগে থেকে আবার যোগাযোগ বন্ধ করে দেন, যা এখনো অব্যাহত আছে। নেতাদের এই নোংরামিতে কর্মী-সমর্থক, বিশেষ করে তৃণমূল আওয়ামী লীগ পরিবার অস্বস্তির পাশাপাশি চমর হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
এ বিষয়ে আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ, সাদিক আব্দুল্লাহ এবং তালুকদার মো. ইউনুসসহ নেতৃত্বসারির নেতাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা না গেলেও বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের প্রাক্তন সভাপতি আমির উদ্দিন মোহন বলছেন, লুটেরার দল অর্থ লুট করে পালিয়ে গেছে।
আওয়ামী লীগ আর নৌকা তো ছিল তাদের একমাত্র সাইনবোর্ড, যা সামনে রেখে ধান্ধা করে একেকজন ক্রোড়পতি হয়েছেন। দেশে-বিদেশে অর্থ জমাসহ করেছেন গাড়ি-বাড়ি, এখন সেখানে বিলাসী জীবন-যাপন করছেন, দেশে মার খাচ্ছে, হামলা-মামলার শিকার হচ্ছে আওয়ামী লীগের নিবেদিত কর্মীরা।
আপনার মতামত লিখুন :