শিল্পায়ন-নগরায়ণের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা। সেই চাহিদা মেটাতে দেশীয় উৎসের পাশাপাশি আমদানিও করা হচ্ছে সমানে। কিন্তু প্রতিদিনই কমছে দেশীয় গ্যাসকেন্দ্রগুলোর মজুদ। কমে যাচ্ছে উৎপাদন।
একসময় দেশীয় গ্যাসকেন্দ্র থেকে দৈনিক ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। কিন্তু গত বছরের শেষ নাগাদ উৎপাদন কমে এসেছে ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
এদিকে উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও শুধু পাইপলাইন না থাকায় সক্ষমতার সবটুকু উৎপাদন করতে পারছে না ভোলার গ্যাসকূপগুলো। সরকার সিএনজি (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস) বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আকারে এটি আনার জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করলেও এতে খরচ পড়ছে দ্বিগুণ।
তাই আগ্রহ হারাচ্ছে কোম্পানিগুলো। সমাধান একমাত্র পাইপলাইন; যা ২০২৯ সালের আগে হওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এতে করে গ্যাসের উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে না কাক্সিক্ষত গ্যাস।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) বলছে, এই সময়ের মধ্যে ৯ কূপের প্রায় ২ টিসিএফ ঘনফুট গ্যাস অব্যবহৃতই থেকে যাবে।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দ্বীপ জেলা ভোলায় এখন পর্যন্ত দুটি গ্যাসফিল্ড আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে ৯টি কূপ গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। যেগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু স্থানীয়ভাবে চাহিদা না থাকা এবং মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য পাইপলাইন না থাকায় মাত্র ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন করা হচ্ছে।
এখনই আরও ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেখানে আরও ১৫টি কূপ খননের লক্ষ্যে কাজ করছে পেট্রোবাংলা। কিন্তু পাইপলাইন না হলে বা সিএনজি আকারে আনা না হলে এই কূপগুলোতে গ্যাস পাওয়ার পরও অব্যবহৃতই রয়ে যাবে। যদিও বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন তৈরির কাজ শুরু করেছিল।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই কাজে ভাটা পড়ে। তৎকালীন সরকার ভোলা-বরিশাল, বরিশাল-খুলনা, খুলনা-রংপুর পাইপলাইন তৈরির জন্য একটি প্রাক-সমীক্ষা শুরু করেছিল। দেশের স্বার্থ বিবেচনায় এই পাইপলাইন নিয়ে বর্তমান সরকারকে কাজ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের। প্রয়োজনে পুনরায় সম্ভাবনা সমীক্ষা চালানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা।
জানা যায়, ভোলার মোট ৯টি কূপের মধ্যে শাহবাজপুর গ্যাসফিল্ডে সর্বোচ্চ উৎপাদন হচ্ছে ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যেমে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৮০ থেকে ৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বাকিটা উদ্বৃত্ত থেকে যেত।
আর ভোলা নর্থ-২ ও ইলিশা-১-এর উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ থেকে ৬২ মিলিয়ন হলেও এটি পুরোপুরি অব্যবহৃত। পরে সিএনজি আকারে আনার উদ্যোগ নেয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু এই চুক্তি নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন খরচ বেশি ধরার অভিযোগ করেন অনেকেই।
ভোলার গ্যাসের দামের বিষয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতিতে দেশে বিদ্যুৎসহ শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট নিরসনে ভোলা অঞ্চলের উদ্বৃত্ত গ্যাসে সর্বোত্তম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এরই অংশ হিসেবে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিসিএল) তত্ত্বাবধানে ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন লিমিটেডের মাধ্যমে গ্যাস কম্প্রেসড করে নিয়ে এসে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) আওতাধীন এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের সরবরাহ করা হবে।
এক্ষেত্রে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম হবে ৪৭ দশমিক ৬০ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের চার্জ ৩০ দশমিক ৫০ টাকা, ফিড গ্যাসের দাম ১৭ টাকা এবং ডিমান্ড চার্জ শূন্য দশমিক ১০ টাকা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিই হোক বা বাড়তি ব্যয়ের কারণেই হোক, কোম্পানিগুলো সিএনজি আকারে ভোলার গ্যাস আনার আর কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না জানিয়ে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শোয়াইব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ভোলার মোট ৯টি কূপের মধ্যে শাহবাজপুর গ্যাসফিল্ডে সর্বোচ্চ উৎপাদন হচ্ছে ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
এর মাধ্যমে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৮০ থেকে ৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বাকিটা উদ্বৃত্ত থেকে যেত। আর ভোলা নর্থ-২ ও ইলিশা-১-এর উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ থেকে ৬২ মিলিয়ন হলেও এটি পুরোপুরি অব্যবহৃত ছিল।
তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে সিএনজি আকারে আনা হবে ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস। সিএনজি আকারে গ্যাস ব্যবহার করতে মূলত ‘ক্যাসকেড’ পদ্ধতির পরিকল্পনা করা হয়। ক্যাসকেড হচ্ছে উচ্চচাপের গ্যাস সিলিন্ডার স্টোরেজ সিস্টেম, যেখানে অনেকগুলো ছোট ছোট সিলিন্ডার থাকে।
কম্প্রেসর দিয়ে সেগুলো রিফিল করে অন্যত্র পরিবহন করা হয়। এরপর সেই গ্যাস বিতরণ কোম্পানির পাইপলাইনে কিংবা সরাসরি শিল্প এলাকায় বিতরণ করা হয়। এতদিন সিএনজি আকারে গ্যাস সরবরাহের এই পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবসম্মত, ব্যবহারোপযোগী এবং বৈশ্বিকভাবে কীভাবে সরবরাহ করা হয়, সেসব দিক বিবেচনা করেছি।
কয়েকটি কোম্পানিও এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু এটি প্রায় অসম্ভব। তাই আপাতত পাইপলাইন ছাড়া ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা প্রায় অসম্ভব। এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে অন্তত ২০২৯ সাল পর্যন্ত। পেট্রোবাংলাও এ নিয়ে কাজ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় ভোলার গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই। দ্বীপ জেলাটি থেকে পাইপলাইন না থাকায় সিএনজি কিংবা এলএনজি আকারে গ্যাস আনা ব্যয়বহুল হলেও বিপুল পরিমাণ ডলার সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।
তবে খরচ একটু বেশি পড়লেও ভোলার উৎপাদন সক্ষমতার সব গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য যা করণীয়, তা করার তাগিদ দিয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমদানি করতে গিয়ে আমাদের রিজার্ভের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
আমাদের দেশের অভ্যন্তরে যেখানে উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে শুধু পাইপলাইন না থাকার কারণে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাবে না, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। ভোলা যেহেতু দ্বীপ অঞ্চল, সেহেতু ওই অঞ্চলে পাইপলাইন তৈরি কিছুটা কঠিন।
কিন্তু অসম্ভব কিছু নয়। সরকার চাইলে আগের সমীক্ষা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনে নতুন সমীক্ষা চালিয়ে পাইপলাইন তৈরির ব্যবস্থা করতে পারে। এর আগে সিএনজি বা এলএনজি আকারে যত কম খরচে সম্ভব তা জাতীয় গ্রিডে আনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তবে কয়েকটি কোম্পানিকে ভোলার গ্যাস আনার সুযোগ দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের। এই লক্ষ্যে গত ডিসেম্বরে দরপত্রও আহ্বান করার কথা ছিল।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ভোলায় ৭০ এমএমসিএফ গ্যাস পাওয়া গেলেও পাইপলাইন না থাকায় ওই গ্যাস ঢাকায় বা শিল্প এলাকায় আনা যাচ্ছে না।
তাই এই গ্যাস সিএনজি বা এলএনজিতে রূপান্তর করে আনার ইচ্ছা থাকলেও এটি ব্যয়বহুল। পাইপলাইন ছাড়া এই গ্যাস সহজলভ্য হবে না। এক্ষেত্রে কিছুটা সময় তো লাগবেই।
প্রসঙ্গত, দ্বীপ জেলা ভোলায় ১৯৯৫ সালে গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার হওয়ার আড়াই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই জ্বালানি উত্তোলন নিয়ে বৃহৎ কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বিভিন্ন সময়ে নানামুখী পরিকল্পনা করা হলেও কখনো অর্থনৈতিক আবার কখনো রাজনৈতিক কারণে তা মুখ থুবড়ে পড়ে।
কূপগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও ৬৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে দৈনিক। সেই গ্যাস স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আবাসিকে সরবরাহ করছে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড।
ভূতত্ত্ববিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, যেহেতু আমাদের এই মুহূর্তে গ্যাসের সংকট, সেহেতু ভোলার গ্যাস আনা গেলে তা অনেক কাজে আসবে। উৎপাদিত গ্যাস দিনের পর দিন ফেলে রাখার কোনো মানেই হয় না। ভোলায় গ্যাস সিএনজি করে আনা গেলে সেটি হবে একটি ভালো সিদ্ধান্ত।
প্রসঙ্গত, ঢাকা থেকে ভোলার দূরত্ব ১৯০ কিলোমিটার। সেখান থেকে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রের দূরত্ব আরও ২৫ কিলোমিটার। এখানকার উত্তোলন করা গ্যাস এখন ব্যবহার করা হয় দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ছোট পরিসরের কয়েকটি কারখানায়। যে কারণে এখানকার গ্যাস অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় ভোলার গ্যাস পাওয়া গেলে সংকট কিছুটা কাটবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরাও।
আপনার মতামত লিখুন :