অপহরণ ও গুমের কাজগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো। দেখা যেত, এক বাহিনী অপহরণ করেছে, অন্য বাহিনী তাদের আটক করেছে এবং তৃতীয় কোনো বাহিনী হত্যা বা মুক্তির সঙ্গে জড়িত থাকত। গুমের শিকার ব্যক্তিদের আটকে রাখা হতো, এমন আটটির বেশি গোপন বন্দিশালা শনাক্ত করেছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), র্যাব ও পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের মতো সংস্থাগুলো এসব গোপন বন্দিশালা পরিচালনা করত। দেশজুড়ে এসব গোপন বন্দিশালায় গুমের শিকার ব্যক্তিদের আটকে রাখা হতো। এর পাশাপাশি গুমের শিকার ব্যক্তিদের কাউকে কাউকে সাধারণ বন্দিদের সঙ্গেও রাখা হতো বলে কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের গুম তদন্ত কমিশনের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে এসব উল্লেখ করা হয়েছে। গত শনিবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি জমা দেয়। এতে গুমের ঘটনায় নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলেছে কমিশন। গুমের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়েছে, গুমের সঙ্গে শেখ হাসিনা প্রশাসনের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততাও পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুমের ঘটনায় কমিশনে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৭৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৭৫৮টি অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হয়েছে।
গুম সংস্কৃতি বা অপহরণ ও গুমের প্রথা গত ১৫ বছরে গড়ে উঠেছে। আর এগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে, বিষয়গুলো ভাবাও যেত না।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার অনেককে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশন। হত্যার পর লাশ ডুবিয়ে দিতে সিমেন্টের ব্যাগের সঙ্গে বেঁধে তিনটি সেতু থেকে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। গুমের শিকার ২৭ শতাংশ এখনো নিখোঁজ। গুমের পর ভারতে হস্তান্তরের অভিযোগও পেয়েছে কমিশন।
গুম কমিশন তাদের প্রতিবেদনে গুমের শিকার ব্যক্তিদের কীভাবে দিনের পর দিন সবার চোখের আড়ালে বন্দি করে রাখা হতো, তা উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিভিন্ন মেয়াদে বন্দি করে রাখা হতো। তাদের ৪৮ থেকে ৬০ ঘণ্টা থেকে কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস, এমনকি কয়েকজনকে আট বছর পর্যন্ত বন্দি করে রাখা হয়।
সাধারণ একটি ধারণা রয়েছে যে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের শুধু গোপন বন্দিশালায়ই আটকে রাখা হতো। তবে গুম হওয়ার পর জীবিত ফিরে আসতে পারা ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারে বেরিয়ে এসেছে যে অনেককে এমন সব বন্দিশালায় রাখা হয়েছিল, যেখানে সাধারণ বন্দিদেরও রাখা হতো। এর উদাহরণ হিসেবে ডিবির হাতে বন্দি ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে বৈধ ও অবৈধ বন্দিদের একই বন্দিশালায় রাখার কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিরা বন্দিদশায় কী জটিল অবস্থার মধ্যে থেকেছেন, তা ধারণা করা যায়। একই চত্বরের ভেতর বন্দিদের অবৈধ কক্ষ থেকে বৈধ বন্দিদের কক্ষে সরিয়ে নেওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
গুম কমিশন বলছে, খুব সম্ভবত গুমের শিকার ব্যক্তিদের বৈধ বন্দিদের সঙ্গে রাখার মাধ্যমে তাঁদের অবৈধভাবে আটক রাখার বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হতো।
বেঁচে ফেরা গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেওয়ার মাধ্যমে কমিশন তাদের কোথায় কোথায় বন্দি রাখা হতো, তার একটি মানচিত্র অনুমান করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিবেদনে এর একটি উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘যেমন গুমের শিকার এক ব্যক্তি একটি বন্দিশালায় একটি অন্য ধরনের দরজা থাকার কথা বলেছেন। এর ফলে আমরা একটি কক্ষ শনাক্ত করতে পেরেছি, যেটি একসময় তিনটি আলাদা কক্ষে ভাগ করা ছিল। যদিও আমাদের সেখানে পরিদর্শনের আগে ওই পার্টিশন ভেঙে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য নিশ্চিত করতে সেখান থেকে আরও একটি প্রমাণ আমরা তালিকাভুক্ত করেছি।’ এ ছাড়া বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার থেকে কমিশন একই বন্দিশালার ওইসব এলাকা চিহ্নিত করতে পেরেছে যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে সাধারণ বন্দিদেরও রাখা হতো। একই বন্দিশালায় এভাবে অবৈধ ও বৈধ বন্দিদের পালা করে রাখার বিষয়টি কমিশন গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটা ইচ্ছাকৃতভাবে অবৈধভাবে আটক ব্যক্তিদের আড়াল করার প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয় এবং এ বিষয়ে পরবর্তীকালে আরও তদন্তের প্রয়োজন।
গোপন বন্দিশালা দেখতে তদন্ত কমিশন যেসব দপ্তরে গেছে সেগুলো হলো ডিজিএফআই, সিটিটিসি, ডিএমপির ডিবির প্রধান কার্যালয়, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ডিবি, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন ইউনিট ২, ৪, ৭ ও ১১, র্যাব-২, সিপিসি-৩, র্যাবের সদর দপ্তর, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার এবং এনএসআইয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ১৫ বছরে ১ হাজার ৬৭৬টি জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ রেকর্ড হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৭৫৮টি অভিযোগ কমিশন পর্যালোচনা করেছে। ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ১৩০ গুমের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত গুমের ২১টি অভিযোগ জমা পড়েছে।
গুমের শিকার ২৭ শতাংশ এখনো নিখোঁজ: কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ জীবিত ফিরে এসেছেন; বাকি ২৭ শতাংশ এখনো নিখোঁজ। ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের অনেকে জানিয়েছেন, গুম, নির্যাতন করার এবং বন্দি করে রাখার পর তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাস দমন আইন, অস্ত্র আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে।
গুমের পর ভারতে হস্তান্তরের ঘটনাও ঘটেছে: কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে জোর করে গুমের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে র্যাব, ডিবি এবং সিটিটিসি মূল ভূমিকা পালন করেছে। এ ছাড়া এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের সংশ্লিষ্টতার কথাও উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুমের ঘটনায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিদেশে পালিয়ে গিয়ে জবাবদিহি এড়িয়ে গেছেন। গুমের ঘটনা শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, এটি আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ।
আপনার মতামত লিখুন :