কানাডার গোয়েন্দা সংস্থা কানাডিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (CSIS) সোমবার (২৪ মার্চ) জানিয়েছে যে, ভারত ও চীন আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করতে পারে। এই অভিযোগ এমন এক সময়ে আসলো যখন কানাডার সাথে এই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কানাডার আগাম নির্বাচনের বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সিএসআইএস (CSIS)-এর উপপরিচালক ভ্যানেসা লয়েড জানান যে, বৈরি রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ‘চীনের পিপলস রিপাবলিক (PRC) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত টুল ব্যবহার করে কানাডার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার সম্ভাবনা খুব বেশি।’
এছাড়া, চীন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে এমন কিছু প্রচার চালাতে পারে যা তাদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং গোপন ও বিভ্রান্তিকর কৌশলের মাধ্যমে কানাডায় বসবাসরত চীনা জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়গুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতেরও হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও অভিপ্রায় আছে: কানাডার দাবি
ভ্যানেসা লয়েড আরও বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে ভারত সরকার কানাডার সম্প্রদায় ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও ইচ্ছা রাখে, যাতে তারা তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে।’
তবে ভারত ও চীন, যারা আগে থেকে কানাডার এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, তারা এই নতুন অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ভারত ও কানাডার সম্পর্কের টানাপোড়েন
এ বছরের জানুয়ারিতে, কানাডার এক কমিশনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কানাডার নির্বাচনে কিছু বিদেশি সরকার হস্তক্ষেপ করেছে। তবে ভারত এই অভিযোগকে `অমূলক` বলে প্রত্যাখ্যান করে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) এক বিবৃতিতে জানায়, ‘আমরা এই প্রতিবেদনের ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি এবং আশা করছি যে অবৈধ অভিবাসনকে সহায়তা করার অবকাঠামো আর প্রসারিত করা হবে না।’
কানাডিয়ান সংবাদপত্র দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল দাবি করেছিল যে ভারত প্রক্সি এজেন্টদের মাধ্যমে তিনটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের গোপনে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।
নির্বাচনে রাশিয়া ও পাকিস্তানের হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও প্রকাশ
ভ্যানেসা লয়েড জানান, শুধু ভারত ও চীনই নয়, রাশিয়া ও পাকিস্তানও কানাডার আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘রাশিয়া সোশ্যাল মিডিয়া ও নিউজ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রচারণা চালানোর জন্য বিভিন্ন নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা ক্রেমলিনের বক্তব্যকে উস্কে দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্ভাবনা রয়েছে যে রাশিয়া এসব অনলাইন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কানাডায় ভুল তথ্য ছড়ানোর জন্য বিদেশি তথ্য হেরফের ও হস্তক্ষেপমূলক কার্যক্রম চালাতে পারে।’
এছাড়া, পাকিস্তানও এর কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কানাডার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে পারে। বিশেষত, ‘পাকিস্তান তার রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি ভারতের বৈশ্বিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করতে পারে।’
ভারত-কানাডা সম্পর্কের উত্তেজনা
ভারত ও কানাডার সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ভারতের বিরুদ্ধে খলিস্তানি সন্ত্রাসী হরদীপ সিং নিজ্জারের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনার পর থেকেই এ অবনতির শুরু।
ভারত এই অভিযোগকে নির্লজ্জ ও অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
পরে, কানাডা ভারতীয় কর্মকর্তাদের সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে ভারত ছয়জন কানাডিয়ান কূটনীতিককে বহিষ্কার করে এবং অটোয়াতে নিযুক্ত তাদের রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে আনে।
চীন-কানাডা সম্পর্কের টানাপোড়েন
শুধু ভারত নয়, কানাডার সঙ্গে চীনের সম্পর্কও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খারাপ হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে, চীন কানাডার কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের ওপর ২.৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি শুল্ক আরোপ করে। এটি কানাডার চীনা ইলেকট্রিক যানবাহন (EV), ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কের প্রতিশোধ হিসেবে করা হয়।
ভারত, চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কানাডার গোয়েন্দা সংস্থার এই নতুন অভিযোগ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। আগামী ২৮ এপ্রিলের নির্বাচনের আগে এ ধরনের অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে থাকবে।
সূত্র: এনডিটিভি