মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমদানি করা গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সহযোগীদের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমাদের অর্থ ও চাকরি ফিরিয়ে আনছি: ট্রাম্প
বুধবার (২৬ মার্চ) হোয়াইট হাউসে এক ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, এই শুল্ক আরোপের মাধ্যমে তিনি বিদেশিদের কাছ থেকে অর্থ পুনরুদ্ধার করবেন, যারা ‘আমাদের চাকরি ও সম্পদ লুট করেছে’।
ট্রাম্প বলেন, ‘বন্ধু হোক বা শত্রু, তারা আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু নিয়েছে। কখনো কখনো বন্ধুরাই শত্রুর চেয়েও বেশি ক্ষতি করেছে।’
তিনি এই সিদ্ধান্তকে উৎসাহজনক বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, এটি মার্কিন উৎপাদন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করবে।
এপ্রিল ২ থেকে কার্যকর হবে নতুন শুল্ক
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এই নতুন শুল্ক মার্কিন অটোমোবাইল শিল্পকে রক্ষা ও শক্তিশালী করবে, যা দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক প্রতিযোগিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তির (USMCA) আওতায় আমদানি করা গাড়ির ক্ষেত্রে বিশেষ শর্ত থাকবে। আমদানিকারকদের সুযোগ দেওয়া হবে তাদের পণ্যের কত অংশ মার্কিন উৎপাদিত, তা প্রমাণ করার, যাতে শুধু অ-মার্কিন কনটেন্টের ওপর শুল্ক পরিশোধ করতে হয়।
শুল্কের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), কানাডা ও জাপানের কঠোর বিরোধিতা করেছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এক পোস্টে বলেন, ‘এই শুল্ক ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর এবং ভোক্তাদের জন্য আরও খারাপ।’
তিনি আরও জানান, ইইউ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজবে, তবে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই পদক্ষেপকে কানাডার শ্রমিকদের ওপর সরাসরি আক্রমণ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, ‘আমরা আমাদের শ্রমিকদের, আমাদের কোম্পানিগুলোকে এবং আমাদের দেশকে রক্ষা করব।’
জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা জানান, ‘জাপান তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সব বিকল্প বিবেচনা করবে।’
বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে ঝড় তুলতে পারে এই সিদ্ধান্ত
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই শুল্কের ফলে বিশ্বব্যাপী অটোমোবাইল শিল্পে ব্যাপক প্রভাব পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম গাড়ি আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- মেক্সিকো
- কানাডা
- দক্ষিণ কোরিয়া
- জাপান
- জার্মানি
২০২৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের যাত্রীবাহী গাড়ি আমদানি করেছে।
এই ঘোষণার প্রভাবে জাপানি ও দক্ষিণ কোরিয়ান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারমূল্য হঠাৎ কমে গেছে। টয়োটা, হোন্ডা, নিসান-এর শেয়ারমূল্য কমেছে ১.৮৬% থেকে ৩.৩৫% । অপরদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়া-এর শেয়ারমূল্য কমেছে ২.২৭%।
বিশ্লেষক ড্যানিয়েল আইভস সতর্ক করে বলেন, ‘এই শুল্ক বাস্তবায়ন হলে এটি পুরো গাড়ি শিল্পের জন্য একপ্রকার ঝড়ের মতো হবে।’
মার্কিন ভোক্তাদের জন্য খারাপ খবর
শুল্কের কারণে মার্কিন ক্রেতাদের জন্য গাড়ির দাম বাড়তে পারে, কারণ মার্কিন বাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় ৫০ ভাগ গাড়ি আমদানি করা হয়।
অটোস ড্রাইভ আমেরিকা-এর প্রেসিডেন্ট জেনিফার সাফাভিয়ান বলেন, ‘এই শুল্কের ফলে গাড়ি তৈরি ও বিক্রি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে, যা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের জন্য বেশি দাম এবং কম বিকল্প সৃষ্টি করবে।’
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত হয়তো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বিশেষ করে নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে।
ট্রাম্প এর আগেও চীনসহ বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা মার্কিন অর্থনীতিতে মিশ্র প্রভাব ফেলেছে।
তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী সপ্তাহে আরও পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করা হবে, যা তাদের ওপর পড়বে, যারা বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা নিচ্ছে।
তবে তিনি শুল্কের কঠোরতা নিয়ে বলেন, ‘এই শুল্ক খুব নরম হবে। এটি অনেক ক্ষেত্রে সেই শুল্কের চেয়েও কম হবে, যা তারা আমাদের ওপর বছরের পর বছর ধরে আরোপ করেছে।’
ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতির ফলে বিশ্ব বাণিজ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে, বিশেষ করে ইউরোপ, কানাডা ও জাপানের সঙ্গে। এর ফলে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়তে পারে, কারণ গাড়ির দাম বাড়বে।
এখন দেখার বিষয়, এই শুল্ক বাস্তবায়ন হলে এর প্রভাব কীভাবে পড়ে এবং মার্কিন মিত্র দেশগুলো কী ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেয়।
সূত্র: আলজাজিরা
আপনার মতামত লিখুন :