একটি প্যারিস আদালত মঙ্গলবার জানিয়েছে যে, কট্টর-ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি দলের নেত্রী মারিন লে পেনের বিরুদ্ধে দেওয়া পাঁচ বছরের নির্বাচনি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত তিনটি আপিল জমা পড়েছে। তবে কারা আপিল করেছে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
আদালতের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আপিলগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত রায় ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে দেওয়া হবে, যা ২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেই আসতে পারে। যদি এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে, তাহলে লে পেনের নির্বাচন করার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ
সোমবার (৩১ মার্চ), এক নিম্ন আদালত মারিন লে পেন ও তার দলের ২৪ জন সদস্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল আত্মসাতের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালত লে পেনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়া পাঁচ বছরের নির্বাচনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে তিনি ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না, যদি না তিনি আপিল করে রায় বাতিল করাতে পারেন।
লে পেনের আইনজীবী জানিয়েছেন, তিনি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন, তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
লে পেনের সমর্থকদের প্রতিবাদ
এই রায় লে পেনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, তিনি ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অন্যতম ফেভারিট প্রার্থী ছিলেন। তবে আপিল চলাকালীনও তার নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
লে পেনের সমর্থকরা এই রায়কে পক্ষপাতদুষ্ট ও গণতন্ত্রবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন। ন্যাশনাল র্যালি দলের প্রেসিডেন্ট, জর্ডান বারদেলা ফরাসিদের প্রতিবাদে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি তার দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ফরাসিদের ক্ষুব্ধ হওয়া উচিত, এবং আমি তাদের বলছি- ক্ষুব্ধ হন! আমরা এই সপ্তাহান্তে রাস্তায় নামব।’
বারদেলা আরও জানান, ফ্রান্সজুড়ে প্রচার, লিফলেট বিতরণ, সভা-সমাবেশ এবং সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হবে। প্যারিসে আসছে রোববার বিশাল সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে ন্যাশনাল র্যালি।
লে পেন নিজেও এই রায়কে পারমাণবিক হামলার মতো আখ্যা দিয়ে বলেছেন যে, এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ষড়যন্ত্র।
ফরাসি পার্লামেন্টে উত্তপ্ত বিতর্ক
ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদে (পার্লামেন্ট) এই ইস্যুটি নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। মধ্য-ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বাইরু বলেন, তিনি রায়কে সমর্থন করেন, তবে এই ধরনের তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞার আইনি বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেন, ‘যেকোনো গুরুতর আইনি সিদ্ধান্ত আপিলের সুযোগ থাকা উচিত। যদি আইনপ্রণেতারা এই আইন পরিবর্তন করতে চান, তাহলে তাদের এটি সংশোধন করা উচিত।’
ন্যাশনাল র্যালির মিত্র সংসদ সদস্য এরিক সিওত্তি ঘোষণা করেছেন যে, তিনি এই আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেবেন।
ম্যাক্রোঁর নীরবতা ও জনমত জরিপ
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, যিনি ২০১৭ ও ২০২২ সালের নির্বাচনে লে পেনকে পরাজিত করেছিলেন, এখনো এই রায়ের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, বেশিরভাগ ফরাসি নাগরিক রায়ের সঙ্গে একমত। এলাবে জরিপে দেখা গেছে, ৫৭ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেন রায় যথাযথ, কারণ লে পেন অর্থ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে, ৪২ ভাগ মনে করেন এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
লে পেনের শক্ত ঘাঁটি হেঁনিন-বোম শহরে তার সমর্থকরা ‘গণতন্ত্র বাঁচান, লে পেনকে সমর্থন করুন!’ লেখা লিফলেট বিতরণ করেছেন। তবে স্থানীয় জনগণের প্রতিক্রিয়া মিশ্র ছিল।
লে পেনের ভবিষ্যৎ ও ২০২৭ সালের নির্বাচন
লে পেনের অনুপস্থিতিতে জর্ডান বারদেলা দলের হয়ে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। তবে লে পেন স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি সহজে রাজনীতি ছাড়ছেন না।
তিনি বলেন, ‘আমি এভাবে হার মানতে যাচ্ছি না।’
লে পেনের ভাগ্য এখন ফরাসি আদালতের আপিল বিভাগের হাতে, যেখানে তিনি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের শেষ চেষ্টা করবেন।