সম্প্রতি ভারতের পাক্ষিক ম্যাগাজিন ফ্রন্টলাইনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাংলাদেশ ও ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সম্পর্কিত দ্বৈত নীতির দিকে ইঙ্গিত করায় তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ সাক্ষাৎকারটির মূল বক্তব্যের সারাংশ-
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ নিয়ে ভারত মন্তব্য করার আগে নিজেদের সংখ্যালঘুদের অবস্থাও বিবেচনা করা উচিত।
ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণের প্রতিক্রিয়াও বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা শুধু ধর্মীয় কারণেই নাও হতে পারে, রাজনৈতিক কারণও থাকতে পারে।
দেশের একটি বড় অংশ ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘু সুরক্ষার পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সংবিধানের "বহুত্ববাদ" শব্দ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, এটি পর্যালোচনাধীন।
ভারত-বাংলাদেশ সংখ্যালঘু ইস্যুতে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া
ড. দেবপ্রিয় মূলত বলতে চেয়েছেন যে, ভারত যদি নিজ দেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি আরও সহনশীল আচরণ করত, তাহলে হয়তো বাংলাদেশেও সংখ্যালঘুদের প্রতি মনোভাব আরও ইতিবাচক হতে পারত। কারণ, ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর আচরণের একটি প্রভাব বাংলাদেশে পড়ে এবং একইভাবে, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার একটি প্রভাব ভারতের হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কেও দেখা যায়।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ
এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে- ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বলেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২,৪০০টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, আর ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ৭২টি। কিন্তু এই সংখ্যা অতিরঞ্জিত কি না?
ড. দেবপ্রিয় পরিসংখ্যানের যথার্থতা নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি, তবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণেও এসব ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
ভারতের দ্বৈত নীতি ও মুসলিম সংখ্যালঘুর অবস্থা
ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, বাবরি মসজিদ ইস্যু, মুসলমানদের ওপর গণপিটুনি , এবং মোদী সরকারের অধীনে সংখ্যালঘুদের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ অনেক বিতর্ক তৈরি করেছে।
ভারতে এসব ঘটনার পরও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিয়ে ভারতীয় নেতারা যদি উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তবে তা **কিছুটা দ্বৈত নীতির মতো মনে হয়।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু পরিস্থিতি
ড. দেবপ্রিয় বলেছেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, এবং সেই সময় সংখ্যালঘুরা হয়তো রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশের কিছু মানুষ ইতিহাস পুনর্লিখন করতে চায়, কিন্তু তাতে জাতীয় নীতি পরিবর্তিত হবে না। এছাড়া বাংলাদেশে এখনো একটি বিশাল অংশ ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায়।"**
সংবিধান পরিবর্তন বিতর্ক
সম্প্রতি বহুত্ববাদ শব্দ বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন যে, এটি এখনো পর্যালোচনাধীন, তাই অপ্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময় আসেনি।
চূড়ান্ত বিশ্লেষণ
ভারত যদি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়, তাহলে নিজ দেশের মুসলমানদের প্রতি আচরণ নিয়েও ভাবা উচিত। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়েছে, তবে এটি শুধু ধর্মীয় কারণেই ঘটেনি, রাজনৈতিক কারণও ছিল। সংবিধান পরিবর্তন এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, তাই এ নিয়ে বাড়তি উদ্বেগও অপ্রয়োজনীয়। বাংলাদেশের একটি বড় অংশ ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘু সুরক্ষার পক্ষে রয়েছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সরাসরি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের দ্বৈততা এবং সংখ্যালঘু ইস্যুর বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, যা কূটনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।